Follow us

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বন্ধ করুন: জাতিসংঘ

কামরান রেজা চৌধুরী ও আবদুর রহমান
ঢাকা ও কক্সবাজার
2018-11-13
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
রাখাইনে নির্যাতনের মুখে দেশান্তরের এক বছর পূর্তিতে কক্সবাজারের কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে রোহিঙ্গাদের বিক্ষোভ সমাবেশ। ২৫ আগস্ট ২০১৮।
রাখাইনে নির্যাতনের মুখে দেশান্তরের এক বছর পূর্তিতে কক্সবাজারের কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে রোহিঙ্গাদের বিক্ষোভ সমাবেশ। ২৫ আগস্ট ২০১৮।
[রয়র্টাস]

আপডেট: ১৩ নভেম্বর, ইস্টার্ন টাইম বিকেল ৪:০০

আগামী ১৫ নভেম্বর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু না করতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনার মিশেল ব্যাশলে।

মঙ্গলবার জেনেভা থেকে দেয়া এক বিবৃতিতে হাইকমিশনার বলেন, বর্তমান অবস্থায় তাঁদের ফেরত পাঠানো হবে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী কাজ।

কারণ সেখান থেকে রোহিঙ্গাদের হত্যা, গুম, গ্রেপ্তার, চলাচলের স্বাধীনতা সীমিত করাসহ বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আসছে। সেখানে তাঁদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার কোনো সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না।

তিনি বলেন, “রাখাইনের কেন্দ্রস্থলে এক লাখ ৩০ হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষ ক্যাম্পে অবস্থান করছে যাদের অধিকাংশই রোহিঙ্গা। এ ছাড়া, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে পাঁচ হাজার রোহিঙ্গা আটকা পড়ে আছে। এবং সিত্তের অং মিঙ্গালার ওয়ার্ডে আরও চার হাজার মানুষকে আটকে রাখা হয়েছে।”

তিনি বলেন, প্রত্যাবাসনের কথা শুনে কক্সবাজারে দুজন মানুষ আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন।

হাইকমিশনার বলেন, কক্সবাজারে অবস্থানকারী রোহিঙ্গাদের মধ্যে আমরা প্রত্যাবাসন নিয়ে আতঙ্ক প্রত্যক্ষ করেছি। তাঁদের শঙ্কা, ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাঁদের ফেরত পাঠানো হতে পারে।

তিনি বলেন জোর করে শরণার্থী ও রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীকে তাঁদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। কারণ সেখানে তাঁদের জীবনের হুমকি রয়েছে।

ব্যাশলে বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে যে ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো মারাত্মক নৃশংসতা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও এমনকি সম্ভবত গণহত্যার সামিল।

তিনি বলেন, চলমান মানবাধিকার লঙ্ঘনের মধ্যে এই মুহূর্তে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর অর্থ হলো তাঁদের পুনরায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের চক্রে ফেলে দেওয়া, যেসব মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা কয়েক দশক ধরে চলছে।

হাইকমিশনার রাখাইনের সংকটের মূল কারণ উদ্‌ঘাটন করে সেখানে রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে মিয়ানমার সরকারকে আন্তরিকতা দেখানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পদ্ধতিগত বৈষম্য ও নির্যাতন বন্ধ করতে তিনি মিয়ানমারকে আহ্বান জানান।

ব্যাশলে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ‘স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও মর্যাদার সাথে’ ফিরে যাবার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফেরত পাঠানোর আহ্বান জানান।

জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের (জেডব্লিউজি) ৩০ অক্টোবরের সিদ্ধান্ত অনুসারে মিয়ানমার থেকে বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির সে দেশের রাখাইন প্রদেশে প্রত্যাবাসন আগামী ১৫ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী বাংলাদেশ।

পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক এ বিষয়ে মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেন, “প্রত্যাবাসনের বিষয়ে আমরা আশাবাদী। দেখা যাক কী ঘটে।”

রাজধানী ঢাকার একটি হোটেলে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব বিষয়ক একটি কর্মশালায় যোগদান শেষে তিনি একথা বলেন। পররাষ্ট্র সচিব বলেন, “বাংলাদেশ ও মিয়ানমার প্রত্যাবাসনের তারিখ নির্ধারণ করেছে এবং উভয় দেশ ‘নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ি কাজ করছে।”

এদিকে শরণার্থী পূনর্বাসন ও ত্রাণ কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম মঙ্গলবার বেনারকে বলেন, “আমরা প্রত্যাবাসন শুরুর জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্ততি প্রায় সম্পন্ন করেছি। রোহিঙ্গাদের সম্মতির প্রক্রিয়া চলমান।”

তিনি বলেন, আশা রাখি ১৫ তারিখে প্রত্যাবাসন শুরু হবে।

প্রত্যাবাসন শুরু ভাঁওতাবাজি

সাবেক পররাষ্ট্রসচিব মোস্তফা কামাল বেনারকে বলেন, “১৫ নভেম্বর থেকে প্রত্যাবাসন শুরু করা একটি ভাঁওতাবাজি ছাড়া আর কিছু না। কারণ, কোনো রোহিঙ্গা স্বেচ্ছায় সেখানে ফিরে যেতে চাইবে না।”

তিনি বলেন রাখাইনে ফিরে যাওয়ার কোনো পরিস্থিতি এখন সৃষ্টি হয়নি। সেখানে গেলে রোহিঙ্গাদের হত্যা করা হবে। নির্যাতন করা হবে। কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে আটকে রাখা হবে।

মোস্তফা কামাল বলেন, প্রত্যাবাসন আইন অনুযায়ী কোনো শরণার্থীকে জোর করে ফেরত পাঠানো যাবে না।

তিনি বলেন, ফিরে যাওয়ার জন্য রোহিঙ্গাদের রাজি করতে মিয়ানমার সরকারকে কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে, যার মাধ্যমে তারা আশ্বস্ত হবে যে, সেখানে গেলে তারা নিরাপদে থাকতে পারবে।

তাঁর মতে মিয়ানমার সরকার রাখাইনে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেছে কি না তা জানাতে আন্তর্জাতিক সংস্থা, পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের প্রবেশ দিতে হবে। অন্যথায় তারা কীভাবে জানবে যে তারা সেখানে ভালো থাকবে?

এদিকে উনচিপ্রাংয়ে বসবাসকারী রোহিঙ্গা মোহাম্মদ আমিন জানান, “আমাদের কোনো কিছু স্পষ্ট করে বলা হচ্ছে না। আমাদের কিছু নির্ধারিত দাবি আছে; সেগুলো পূরণ না হলে কোনো অবস্থাতেই ফেরত যাব না।”

তিনি বলেন, দাবি পূরণ না হলে মিয়ানমার গিয়ে আবার নির্যাতনের মুখে পড়তে হবে তাঁদের।

রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য বরাদ্দ

রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট মোকাবিলার অংশ হিসেবে শরণার্থী ও তাদের আশ্রয়দাতা স্থানীয় কমিউনিটির শিশু ও কিশোরসহ ৮৮হাজার ৫০০ শিশু ও কিশোরকে শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে এক কোটি ২০ লাখ ডলারের অর্থ বরাদ্দ দিচ্ছে ‘এডুকেশন ক্যানট ওয়েইট’ (ইসিডব্লিউ)।

শিক্ষার জন্য একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা নিশ্চিত করতে এবং মান সম্পন্ন শিক্ষা প্রাপ্তির সুযোগ অব্যাহত রাখতে ইউনিসেফ, ইউনেসকো, ইউএনএইচসিআরকে এই তহবিল দেওয়া হচ্ছে বলে এক সংবাদ বিবৃতিতে জানিয়েছে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন