মিয়ানমারের নির্যাতিত রোহিঙ্গারা ছুটছে বাংলাদেশের দিকে

ঢাকা থেকে শাহরিয়ার শরীফ
2016.11.16
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
মিয়ানমারের নির্যাতিত রোহিঙ্গারা ছুটছে বাংলাদেশের দিকে ইয়াঙ্গুনে একটি পারিবারিক প্রার্থনা সভায় রোহিঙ্গা মুসলিম সম্প্রদায়। ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৬।
ROMEO GACAD/AFP

প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযানের মুখে শত শত রোহিঙ্গা নাফ নদী অতিক্রম করে কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে। গতকাল বুধবার পর্যন্ত বর্ডার গার্ড অব বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরা কমপক্ষে ৮৬ জন রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠিয়েছে। আরও দুই শতাধিক রোহিঙ্গা মুসলিম বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছেন। স্থানীয় বিজিবি ও কোস্টগার্ড এই তথ্য পেয়ে সীমান্ত ও নৌপথে টহল জোরদার করেছে।

এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে ২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল আবুজার আল জাহিদ বেনারকে বলেন, মিয়ানমারের নাগরিকদের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে টেকনাফ সীমান্তে বিজিবির সদস্যদের সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।  এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শরণার্থীদের সঙ্গে কোনো রকম খারাপ আচরণ করা হয়নি, গুলি ছোঁড়ার প্রশ্নই আসে না। নিয়ম অনুযায়ী, তাঁদেরকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

নৌ সীমানায়ও কোস্টগার্ডের টহল জোরদার করা হয়েছে। কোস্টগার্ডের টেকনাফ স্টেশনের লে. কমান্ডার নাফিউর রহমান স্থানীয় সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, মিয়ানমারের কোনো নাগরিক সীমানা অতিক্রম করলে তাঁকে আটক করা হবে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের ২০৮ কিলোমিটার স্থল ও ৬৩ কিলোমিটার নৌ সীমানা রয়েছে। স্থানীয় একাধিক সাংবাদিক টেলিফোনে বেনারকে জানান, কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করে রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে জেলার বাসিন্দাদের সতর্ক করা হয়েছে। বাংলাদেশের জেলেদের রাতের বেলা মাছ ধরতে সমুদ্র বা নদীতে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে বুধবার বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী দীপু মনি ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে শরণার্থীদের অনুপ্রবেশ ঘটুক, এটা বাংলাদেশ সরকার চায় না।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আগামী ২৩ ও ২৪ নভেম্বর মিয়ানমারে অনুষ্ঠেয় দুই দেশের পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠক অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সচিব পর্যায়ের এই বৈঠক সামনে রেখে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াতে দুই পক্ষ একাধিক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত করেছিল।

কূটনৈতিক সূত্র বলছে, কক্সবাজার সীমান্তের ওপারে রাখাইন রাজ্যের উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বাংলাদেশকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। মিয়ানমারে গত বছরের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদলে দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু নতুন করে বাধা হয়ে দাঁড়াল রাখাইন রাজ্যের চলমান উত্তেজনা।

গত কয়েক দিনে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোহিঙ্গা মুসলমান নিহত হওয়ার পর দেশটিতে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। মিয়ানমার সরকার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও ত্রাণকর্মীদের রাখাইন রাজ্যে যেতে দিচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।

মিয়ানমারের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত শনি ও রোববার অন্তত ২৮ জন প্রাণ হারিয়েছে। অন্যদিকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে উদ্ধৃত করে বার্তা সংস্থা রয়টার্স গতকাল জানিয়েছে, মিয়ানমারের মুসলিম জঙ্গিগোষ্ঠীর অন্তত ৬৯ জন সদস্যকে সেনাবাহিনী হত্যা করেছে। সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর ১৭ জন সদস্য।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, রোহিঙ্গারা জীবন বাঁচাতেই ঝুঁকি নিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে সীমান্তে নজরদারি বাড়িয়েছে বাংলাদেশ।

এদিকে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর এর আগে সীমান্ত খুলে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশকে অনুরোধ জানিয়েছে।  ইউএনএইচসিআর-এর ঢাকা প্রতিনিধি ক্রেইগ স্যান্ডার্স বলেন, “আমরা বাংলাদেশ সরকারকে অনুরোধ করছি, তারা যেন মিয়ানমারের সহিংসতা থেকে পালিয়ে আসা এসব মানুষদের জন্য সীমান্ত খুলে দেন। যাতে তারা একটি নিরাপদ আশ্রয়, জরুরি চিকিৎসাসেবা এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য মানবিক সহায়তাও পেতে পারে।”

কক্সবাজারে রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মোজাম্মেল হক বলেন, “রোহিঙ্গারা কক্সবাজারের জননিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। জেলায় প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারী রয়েছে। তাদের কেউ কেউ পাহাড়-জঙ্গল দখল করে বসতি গড়েছে। বিভিন্ন কাজের পাশাপাশি তারা ইয়াবা চোরাচালান ও মানব পাচারে জড়িয়ে গেছে।

বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের সঠিক সংখ্যা কারও জানা নেই। তবে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সূত্রের দাবি হচ্ছে, এই সংখ্যা তিন থেকে পাঁচ লাখ।

কক্সবাজারের শরণার্থী কার্যালয়ের (আরআরসি) তথ্য অনুযায়ী, উখিয়া উপজেলার কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে এখন তালিকাভুক্ত রোহিঙ্গা ১২ হাজার। কিন্তু সরেজমিনে গেলে স্থানীয় লোকজন জানান, এদের সংখ্যা ৭০ থেকে ৯০ হাজার।

কুতুপালং থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে টেকনাফের নয়াপাড়া শরণার্থীশিবিরে তালিকাভুক্ত রোহিঙ্গা ১৮ হাজার। কিন্তু এই শিবিরের কাছেই লেদা এলাকায় আছে অন্তত ২২ হাজার রোহিঙ্গা।

মেরিন ড্রাইভ সড়কের দুই পাশে কলাতলী, বড়ছড়া, হিমছড়ি, দরিয়ানগরসহ আশপাশের এলাকায় পাহাড়ে বসতি গড়েছে রোহিঙ্গারা। এ ছাড়া কক্সবাজার শহরের পাহাড়তলী, লারপাড়া, কলাতলী, আদর্শ গ্রাম, টিঅ্যান্ডটি পাহাড়, সার্কিট হাউস, সিটি কলেজ ও কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় ছোট-বড় ১২টি পাহাড়ে ১৫ হাজারের বেশি ঘরে বসতি প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গার।

উখিয়া বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ ও উখিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হামিদুল হক চৌধুরী বেনারকে বলেন, মিয়ানমার যেন তার নাগরিকদের ফিরিয়ে নেয়, সে ব্যাপারেও আন্তর্জাতিকভাবে চাপ সৃষ্টি করা উচিত। কক্সবাজারের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের এক জায়গায় রাখা উচিত বলে মত দেন তিনি।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নিতে নয় হাজার শরণার্থীর একটি তালিকা মিয়ানমারে পাঠানো হয় দেড় দশক আগে। সেখান থেকে দেড় হাজার শরণার্থীকে ফিরিয়ে নেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছিল মিয়ানমার। কিন্তু ২০০৫ সালের ৫ মে সর্বশেষ তিনজনকে নেওয়ার পর আর কাউকে ফিরিয়ে নেয়নি। বাকি অনিবন্ধিতদের তাদের নাগরিক হিসেবেই স্বীকার করে না দেশটি।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।