Follow us

চার দফা দাবিতে রোহিঙ্গাদের প্রতীকী আন্দোলন

জেসমিন পাপড়ি ও আবদুর রহমান
ঢাকা ও কক্সবাজার
2018-11-26
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
টেকনাফের চাকমারকুল শিবিরে ত্রাণ নিয়ে যাচ্ছেন একজন রোহিঙ্গা। ২২ নভেম্বর ২০১৮।
টেকনাফের চাকমারকুল শিবিরে ত্রাণ নিয়ে যাচ্ছেন একজন রোহিঙ্গা। ২২ নভেম্বর ২০১৮।
[আবদুর রহমান/বেনারনিউজ]

জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের দেওয়া স্মার্টকার্ড নিতে অনীহা প্রকাশ করেছে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা। এরই প্রেক্ষিতে চার দফা দাবিতে সোমবার থেকে তারা প্রতীকী আন্দোলন করছে বলে জানিয়েছেন রোহিঙ্গারা নেতারা। আগামী ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত এ আন্দোলন চলবে।

এ সংক্রান্ত এক বিবৃতিতে রোহিঙ্গারা জানিয়েছে, “আমরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। কারণ, ইউএনএইচসিআর আমাদের তথ্য সংগ্রহ করছে (আঙুলের ছাপ, চোখের ছাপ, জমির কাগজপত্র)।”

“আমরা মনে করি, তারা প্রত্যাবাসনের জন্য এসব তথ্য মিয়ানমার সরকারকে দেবে। আর মিয়ানমার সরকার এসব তথ্য দিয়ে আমাদের ‘আরসা’ অথবা ‘বাঙালি’ হিসেবে তকমা দেওয়ার জন্য অথবা আমাদের পরিবারের সদস্যদের ক্ষতি করার জন্য ব্যবহার করবে।”

তবে চলমান তথ্য সংগ্রহ প্রক্রিয়ার সাথে প্রত্যাবাসনের কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছে ইউএনএইচসিআর।

এদিকে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে লক্ষ্য রেখে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে নজরদারি জোরদার করারও প্রতিবাদ জানিয়েছে রোহিঙ্গারা।

কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) প্রতিনিধি ও চাকমারকুল রোহিঙ্গা শিবিরে ইনচার্জ মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া বেনারকে বলেন, “রোহিঙ্গাদের চার দফা সম্মিলিত একটি চিঠি আমার হাতে এসেছে।”

“এই শিবিরের রোহিঙ্গাদের নতুন করে কার্ড করতে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তাদের ধারণা, এ কার্ডটি প্রত্যাবাসনের জন্য করা হচ্ছে। তাই এ থেকে বিরত থাকতে ঘর থেকে কেউ বের হচ্ছে না। মূলতঃ প্রত্যাবাসনে ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে একটি চক্র চক্রান্ত চালাচ্ছে,” বলেন তিনি।

মাহবুবুর রহমান বলেন, “আন্তজার্তিকভাবে শরণার্থীদের চলাচলের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তারা তাদের ইচ্ছামতো যাতায়াত করতে পারবে না। কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে তারা শিবিরের বাইরে আসা-যাওয়া করবে।”

“তবে আগামী সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি নির্দেশনা থাকায় রোহিঙ্গাদের শিবিরের বাইরে আসা-যাওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ক্যাম্প কর্তৃপক্ষ কড়াকড়ি আরোপ করায় রোহিঙ্গারা নাখোশ হয়েছে। আমরা তো তাদের তাদের ইচ্ছামতো চলাচল করতে দিতে পারি না,” বলেন মাহবুবুর রহমান।

কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ আবুল কালাম বেনারকে বলেন, ‘রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছি, সেখানে কিছু দোকান বন্ধ দেখা গেছে। তবে প্রতীকী অনশনের কথাও শুনেছি, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”

প্রত্যাবাসন, স্মার্ট কার্ড দেওয়া, মিয়ানমার সরকারের সাথে ইউএনএইচসিআরের সমঝোতাসহ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে রোহিঙ্গাদের সাথে আলোচনা করা হয়নি জানিয়ে বিবৃতিতে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে আন্দোলনকারী রোহিঙ্গারা।

কক্সবাজার জেলার টেকনাফের চাকমারকুল শিবিরের কয়েকজন রোহিঙ্গা বেনারকে জানান, ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি উল্লেখ না থাকায় স্মার্টকার্ড না নেওয়ার পাশাপাশি প্রতীকী আন্দোলন করছেন তারা। ক্যাম্পের ভেতরে দোকান বন্ধ রেখে, কাজে যোগ না দিয়ে, ‘ইউএনএইচসিআরের তথ্য সংগ্রহে সাহায্য না করে আন্দোলনে শরিক হয়েছেন শরণার্থীরা।

এই শিবিরের বাসিন্দা মুজিবুর রহমান নামে একজন রোহিঙ্গা বেনারকে বলেন, “এই শিবিরের ছোট-খাটো দোকানপাটগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে। আবার অনেকে দুই দিন ধরে ঘর থেকে বের হচ্ছে না।”

তিনি বলেন, “রোহিঙ্গা শিবিরে নতুন করে স্মার্টকার্ডের জন্য তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তবে কার্ডে আমাদের পরিচয় রোহিঙ্গা লেখা হচ্ছে না। এটা মেনে নেওয়া যায় না।”

“প্রত্যাবাসনের যে প্রক্রিয়া চলছে সেটা আমরা মানি না। কারণ, আমাদের রোহিঙ্গা হিসেবে মেনে নিতে হবে। তাহলে আমরা স্ব-ইচ্ছায় ফিরে যেতে রাজি আছি,” বলছিলেন মুজিবুর।

ফেরার সঙ্গে যাচাই প্রক্রিয়ার সম্পর্ক নেই: ইউএনএইচসিআর

ইউএনএইচসিআর কক্সবাজার অফিসের মুখপাত্র ফিরাস আল খাতেব ইমেইল বার্তায় বেনারকে জানান, রোহিঙ্গাদের ওপর পরিচালিত যাচাই বাছাই নিয়ে রোহিঙ্গারা যে মনোভাব ব্যক্ত করছে সে সম্পর্কে ইউএনএইচসিআর অবগত রয়েছে। অনেক শরণার্থী মনে করেছে যাচাই প্রক্রিয়া থেকে প্রাপ্ত তথ্য তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার হতে পারে। আবার ভিন্নমত পোষণকারী অনেকেই আছেন। যেমন অনেক রোহিঙ্গা শরণার্থী স্বেচ্ছায় যাচাই কাজে অংশ নিচ্ছেন। এ যাচাই কাজটি বাংলাদেশ সরকার ও ইউএনএইচসিআর যৌথভাবে করছে।

তিনি জানান, রোহিঙ্গা যাচাই কাজটি এ বছরের জুনে বাংলাদেশ সরকার ও ইউএনএইচসিআর যৌথভাবে শুরু করে। রোহিঙ্গাদের পরিচয় শনাক্ত, ডকুমেন্ট তৈরি, নিরাপত্তা, সহায়তা প্রদান, জনসংখ্যার পরিসংখ্যান এবং নানা বিষয় নিয়ে একটি সমন্বিত ডেটাবেইস তৈরি এ যাচাই কাজের উদ্দেশ্য। এই উদ্যোগ সংকট সমাধানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র ফিরাস জানান, রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা বৃদ্ধি ও বাংলাদেশে তাদের ত্রাণসহ বিভিন্ন সহায়তাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এ যাচাই কাজ। এর সাথে প্রত্যাবাসনের কোনো সম্পর্ক নেই। মিয়ানমারে ফিরে যাওয়া সম্পূর্ণভাবেই রোহিঙ্গাদের নিজের ইচ্ছার ওপরই নির্ভর করছে। যখনই তারা সেখানে নিরাপদ বোধ করবে ফিরে যাবে। এর সাথে বর্তমান যাচাই প্রক্রিয়ার কোনো সম্পর্ক নেই।

চার দফায় যা আছে

রোহিঙ্গাদের চারদফা দাবি সম্বলিত বিবৃতির একটি কপি বেনার নিউজের প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।

বিবৃতিতে রোহিঙ্গারা জানান, আমরা মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়েছি শুধুমাত্র ‘রোহিঙ্গা’ নামক জাতিগত পরিচয় না থাকার কারণে এবং এটি আমাদের জন্য খুব গুরুত্ব বহন করে।

‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি মিয়ানমারে মুছে দিলেও এটি কার্ডে থাকা জরুরি বলে মনে করছেন তারা।

তাঁদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের স্মার্ট কার্ড নিতে বাধ্য করা যাবে না, স্মার্ট কার্ডে ‘রোহিঙ্গা’ কথাটি উল্লেখ থাকতে হবে।

এছাড়া রোহিঙ্গাদের পারিবারিক তথ্য সংগ্রহ করা থেকে বিরত থাকতে হবে এবং ইতিমধ্যেই যে সব তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে সেগুলো মিয়ানমার সরকারকে প্রদান করা যাবে না।

উখিয়া রোহিঙ্গা শিবিরের নেতা মোহাম্মদ রফিক জানান, ‘আমরা শুরু থেকে দাবি করে আসছি যে মিয়ানমারে আমাদের ‘রোহিঙ্গা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। একইভাবে রাখাইনে স্বাধীনভাবে চলাচল, নাগরিকত্বের পাশাপাশি সব সুবিধা দিতে হবে।”

তিনি বলেন, “মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের জন্য করা পরিবারভিত্তিক তালিকায় “রোহিঙ্গা” শব্দটি উল্লেখ না থাকায় আমরা বিচলিত হয়ে পড়েছি। গত দুই দিন ধরে রোহিঙ্গা শিবিরের অনেক দোকানপাট বন্ধ রয়েছে।”

প্রত্যাবাসনের বিরোধিতায় বৌদ্ধদের বিক্ষোভ

বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের পরিকল্পনার বিরোধিতা করে মিয়ানমারে বিক্ষোভ করেছে উগ্রপন্থী বৌদ্ধরা।

বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, রোববার রাখাইনের রাজধানী সিত্তেতে প্রায় ১০০ বৌদ্ধ ভিক্ষুর নেতৃত্বে এ বিক্ষোভ হয়। এ সময় নির্যাতনের শিকার হয়ে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ‘পলায়নপর শরণার্থী’ হিসেবে উল্লেখ করে বিক্ষোভকারীরা।

উগ্রপন্থী এসব ভিক্ষুরা রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করে রোহিঙ্গা বিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দেয়।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন