বাংলাদেশেও ফেসবুকের বিরুদ্ধে মামলা করতে চান রোহিঙ্গারা

বেনারনিউজ বিশেষ প্রতিবেদন
2021.12.07
ওয়াশিংটন ডিসি
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
বাংলাদেশেও ফেসবুকের বিরুদ্ধে মামলা করতে চান রোহিঙ্গারা রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যার অভিযোগে নেদারল্যান্ডের হেগ শহরে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার দায়ের করা মামলার শুনানিতে অংশগ্রহণের আগে উপস্থিত সবাইকে অভিবাদন জানাচ্ছেন গাম্বিয়ার বিচারমন্ত্রী আবুবকর তামবাদো। ২৩ জানুয়ারি ২০২০।
[রয়টার্স]

ফেসবুকের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের আদালতে একযোগে মামলা হওয়ার ঘটনাকে স্বাগত জানিয়ে কক্সবাজারে বসবাস করা রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন, সুযোগ পেলে বাংলাদেশেও তারা এমন মামলা করতে চান।

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালানোর পেছনে ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়া বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্যকে দায়ী করার পাশাপাশি সহিংস ও উস্কানিমূলক পোস্ট প্রত্যাহার করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমটির বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ এনে ওই দুটি দেশে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের পক্ষে সোমবার মামলা হয়েছে।

রয়টার্স, বিবিসি, এপি, গার্ডিয়ানসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী এসব মামলায় মোট ১৫ হাজার কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়েছে।

ফেসবুক এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নয়, বরং একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে বলে মনে করেন কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ইয়ুথ অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা খিন মং।

“মিয়ানমার সরকার সে দেশের একটি জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে এখনও। আর ওই দেশ ও সরকারকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে ফেসবুক। এমনকি এখন পর্যন্ত ফেসবুক রোহিঙ্গাদের পক্ষে যায় এমনসব তথ্য তাদের সাইট থেকে কোনো ঘোষণা ছাড়াই সরিয়ে নিচ্ছে, যা দুঃখজনক,” বলেন খিন মং।

তাঁর মতে, “মিয়ানমার সরকারের হাতে যখন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী গণহত্যার শিকার হয়েছে, তখন থেকেই সামাজিক এই মাধ্যমটি মিয়ানমারের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছে। তাই ফেসবুকের বিরুদ্ধে মামলাটি আমরা সমর্থন করি।”

“বাংলাদেশ সরকার আমাদের সুযোগ করে দিলে আমরাও ফেসবুকের বিরুদ্ধে মামলা করতে প্রস্তুত। কেননা ১০ লাখ রোহিঙ্গা দেশ ছাড়ার পেছনে এই মাধ্যমটিও সহযোগিতা করেছে। তা না হলে কেন তাঁরা রোহিঙ্গাদের গণহত্যার তথ্য প্রমাণ লুকিয়ে রেখেছে,” বলেন খিন মং।

জনপ্রিয়তা তৈরিতে আগ্রহী ছিল ফেসবুক

কুতুপালং ক্যাম্পে বসবাসকারী অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট মো. মনির বেনারকে বলেন, “২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর রোহিঙ্গাদের ওপর যেভাবে গণহত্যা হয়েছে, তার প্রমাণ অনেকেই ফেসবুকে উপস্থাপন করেছিল। কিন্তু ফেসবুক মিয়ানমারে পক্ষ নিয়ে কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই তা সরিয়ে নিয়েছে। উল্টো ভুল তথ্য দিয়ে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতি বিদ্বেষ ছড়িয়েছে।”

“ফেসবুকের মামলাটি অত্যন্ত সময় উপযোগী। মামলার কারণে ফেসবুক যদি আমাদের তথ্য প্রমাণগুলো ফিরিয়ে দেয়, সেগুলো আমরা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) উপস্থাপন করতে পারব এবং বিচার নিশ্চিত করতে তা অনেক কাজে আসবে,” যোগ করেন মো. মনির।

এদিকে ফেসবুকের বিরুদ্ধে করা অভিযোগগুলোর মধ্যে আছে; ফেসবুকের অ্যালগরিদম রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য ছড়াতে সাহায্য করেছে, স্থানীয় মডারেটর এবং ফ্যাক্ট চেকারদের পেছনে বিনিয়োগ করতে ফেসবুক ব্যর্থ হয়েছে, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংস ও উস্কানিমূলক পোস্ট প্রত্যাহার করতে ব্যর্থতা এবং হিংসা ছড়ানো অ্যাকাউন্টগুলোসহ জাতিগত সহিংসতায় উৎসাহ দেওয়া গ্রুপ ও পেজগুলো বন্ধ না করা।

দাতব্য প্রতিষ্ঠান এমএসএফ এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানে নিহত রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি।

ওই ঘটনার পর রোহিঙ্গারা পালিয়ে এসে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোতে আশ্রয় নেন, সেখানে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছে।

ফেসবুকের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যে দায়ের করা মামলায় এখন পর্যন্ত বাদী ২০ জন, যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাস অ্যাকশন মামলাটি সে দেশে অবস্থানরত আনুমানিক ১০ হাজার রোহিঙ্গার পক্ষে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সানফ্রান্সিসকোর উত্তরাঞ্চলীয় জেলা আদালতে দায়ের করা অভিযোগে বলা হয়, ফেসবুক রোহিঙ্গাদের জীবনের বিনিময়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ছোট দেশটিতে (মিয়ানমারে) তার জনপ্রিয়তা তৈরি করতে আগ্রহী ছিল।

“শেষ পর্যন্ত বার্মা থেকে ফেসবুক তেমন কিছু অর্জন করতে পারেনি। কিন্তু রোহিঙ্গাদের পরিণতি এর চেয়ে আর ভয়াবহ হতে পারে না,” অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

সোমবার ফেসবুকের যুক্তরাজ্য কার্যালয়ে আইনজীবীদের জমা দেওয়া চিঠিতে বলা হয়, তাদের ক্লায়েন্টরা পরিবারসহ মিয়ানমারের শাসক ও বেসামরিক চরমপন্থীদের চালানো গণহত্যার শিকার হয়েছেন। এসবের মধ্যে সহিংসতা, হত্যা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর ঘটনা আছে।

২০১৮ সালে ফেসবুক স্বীকার করে যে, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংস, বিদ্বেষপূর্ণ এবং উস্কানিমূলক বক্তব্য রোধে তারা যথাযথ ভূমিকা নেয়নি।

ফেসবুক দোষ স্বীকার করা সত্ত্বেও কাউকে ক্ষতিপূরণের একটি পয়সা বা অন্য কোনো সহায়তা দেয়নি।

প্রতিষ্ঠানটির পরিচালিত স্বাধীন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, “যারা ঘৃণা ছড়াতে এবং ক্ষতি করতে চায় ফেসবুক তাদের মাধ্যমে যোগাযোগের একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে এবং এতে অফলাইনে সহিংসতার জন্ম দিয়েছে।”

মিয়ানমারে ২০১১ সালে চালু হয় ফেসবুক। তখন থেকে মাধ্যমটি এ প্রক্রিয়াকে সহায়তা করেছে বলে অভিযোগ তোলা হয়।

যুক্তরাজ্যের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, আগামী বছর তারা সে দেশে ও বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্ব করে উচ্চ আদালতে একটি অভিযোগ দায়ের করবেন।

বাংলাদেশের মানবাধিকার কর্মী নূর খান বেনারকে বলেন, “ফেসবুকের বিরুদ্ধে যে আর্জি নিয়ে আদালতে মামলাটি হয়েছে, সেটার সাথে দ্বিমত করার সুযোগ নেই। অবশ্যই রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানো হয়েছে এবং প্রকারান্তরে এক ধরনের ঘৃণা ছড়ানোর কারণেই তারা আক্রান্ত হয়েছে। এর বিচার যেকোনো পর্যায়ে চাওয়াটাই ন্যায়সঙ্গত।”

“এই মামলায় আল্টিমেট বেনিফিসিয়ারি হবে রোহিঙ্গারা, যদি মামলাটি বিচারের দিকে যায়,” যোগ করেন নূর খান।

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন ঢাকা থেকে শরীফ খিয়াম ও কক্সবাজার থেকে আবদুর রহমান।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন