রাখাইনে বন্ধ হয়নি নির্যাতন, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ অব্যাহত

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2017-12-21
Share
নাফ নদী পেরিয়ে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপে সাঁকো পার হচ্ছেন নতুন রোহিঙ্গা শরণার্থীরা নাফ নদী পেরিয়ে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপে সাঁকো পার হচ্ছেন নতুন রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। ২০ ডিসেম্বর ২০১৭।
আবদুর রহমান/বেনারনিউজ।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরুর লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন হলেও রাখাইন রাজ্যে এখনো রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ি পোড়ানোসহ তাঁদের মিয়ানমার ছাড়ার জন্য হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন নতুন আসা শরণার্থীরা।

“যেসব রোহিঙ্গা সেদেশে রয়ে গেছে তাদের দেশ ছাড়ার জন্য হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে। সেখানে এখনো নির্যাতন থামেনি,” বেনারকে বলেন পরিবারসহ বৃহস্পতিবার অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গা শরণার্থী আরফা বেগম (৪৫)।

রাখাইনের বুশিডং বাঘগুনা পাড়া গ্রামের এই নারী জানান, তাঁর স্বামী তিন একর জমিতে ধান ও পানের বরজ করতেন। কিন্তু সেনারা এখন রোহিঙ্গাদের ঘর থেকে বের হতে দিচ্ছে না। এমন অবরুদ্ধ থাকায় খাবারের মজুতও শেষ হয়ে যাচ্ছে।

মংডুর কুমিরখালী গ্রাম থেকে পালিয়ে এসে বুধবার টেকনাফের হোয়াইক্যং পুথিন পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছেন মোহাম্মদ আকবর (৪৬)।

তিনি বেনারকে জানান, “গত সোমবার বিকেলে হঠাৎ করেই সেনাবাহিনীর সদস্য ও স্থানীয় রাখাইনেরা মিলে কুমিরখালী গ্রামে থাকা রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়িতে আগুন দেয়। এত দিন ওই সব গ্রামের বাসিন্দারা দালালদের মাধ্যমে মাসোহারা দিয়ে কোনো রকম বসবাস করছিল।”

আকবর জানান, সোমবার তাদের গ্রামের পাঁচটি বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে তার নিজের কাঠের বাড়িও রয়েছে। এই অবস্থায় তিনি বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন।

তিনি জানান, “ঘরবাড়ি পোড়ানো হয়নি এমন রোহিঙ্গাদের ঘর থেকে বের হতে দিচ্ছে না সেনারা। ফলে তাদের খাবারের অভাবে কষ্টে দিন কাটছে।”

এদিকে গত পাচঁ দিনে প্রায় দেড় হাজার নতুন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে বলে বেনারকে জানিয়েছেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন।

“এখনো রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ অব্যাহত রয়েছে। গত পাঁচ দিনে প্রায় দেড় হাজারের মতো রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে করেছে,” বলেন আলী হোসেন।

অনুপ্রবেশকারী প্রতিটি পরিবারকে চাল, ডাল, সুজি, চিনি, তেল, লবণের একটি করে বস্তা দিয়ে গাড়িযোগে টেকনাফের নয়াপাড়া রোহিঙ্গা শিবিরে পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।

গত মঙ্গলবার ঢাকায় রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের জন্য ৩০ সদস্যের জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করেছে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার। নিজ নিজ দেশের প্রতিনিধিদের নেতৃত্ব দেবেন দু’দেশের পররাষ্ট্রসচিবেরা।

তবে ওই চুক্তির আওতায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সফলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা।

এ প্রসঙ্গে সাবেক পররাষ্ট্রসচিব মহিউদ্দিন আহমেদ বেনারকে বলেন, “সেখানে এখনো জ্বালাও পোড়াও চলছে। তাহলে রোহিঙ্গারা সেখানে কেন যাবে? রাখাইনে পরিস্থিতি নাটকীয় উন্নতি না ঘটলে অবস্থার পরিবর্তন হবে না।”

এদিকে রোহিঙ্গাদের বিদ্রোহী সংগঠন আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) কোনো সদস্য গত আগস্টের পর থেকে এখন পর্যন্ত মংডু শহরে উপস্থিত ছিল না বলে বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে সংগঠনটি।

মিয়ানমার সরকার ও সেনাবাহিনী সেখানে নিরীহ রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে বলেও বিবৃতিতে জানায় আরসা।

জাতিসংঘের সম্পৃক্ততা প্রশ্নবিদ্ধ

বাংলাদেশ ও মিয়ানমার যৌথ কমিটি গঠনের এক দিন পরেই গতকাল বুধবার জেনেভা থেকে এক বিবৃতিতে জাতিসংঘের বিশেষ দূত ইয়াংহি লি-কে মিয়ানমারে প্রবেশ করতে না দেওয়ার কথা জানিয়েছে মিয়ানমার।

রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা নির্যাতনসহ দেশটির মানবাধিকার পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে আসছে জানুয়ারি মাসে মিয়ানমারে যাওয়ার কথা ছিল ইয়াংহি লির।

মিয়ানমারের এই বিবৃতিতে বিস্ময় ও হতাশা প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের দূত ইয়াংহি লি।

তিনি বলেছেন, “এই সহযোগিতা না করার ঘোষণার মধ্য দিয়ে এটা পরিষ্কার হয় যে, রাখাইনসহ মিয়ানমারের অন্যান্য স্থানে অবশ্যই সাংঘাতিক কিছু ঘটেছে।”

মিয়ানমারের এমন সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে লন্ডনভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও। বুধবার এক বিবৃতিতে জাতিসংঘের বিশেষ দূতের সফরে নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্তকে মিয়ানমার সরকারের অত্যন্ত জঘন্য কাজ হিসেবে আখ্যায়িত করেন সংস্থাটির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের পরিচালক জেমস গোমেজ।

রাখাইন সফরের পর গত জুলাইয়ে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইয়াংহি লি বলেছিলেন, গত জানুয়ারিতে রোহিঙ্গাদের যে পরিস্থিতি তিনি দেখে এসেছিলেন, তার তুলনায় পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে।

তার ওই বিবৃতির পরিপ্রেক্ষিতে সপ্তাহ দু-এক আগে ইয়াংহি-কে আর সহযোগিতা না করার কথা জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলকে জানান মিয়ানমারের স্থায়ী প্রতিনিধি তিন লিন।

২০১৪ সালের জুন মাসে মিয়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ র‌্যাপোর্টিয়ার হিসেবে নিয়োগ পাওয়া ইয়াংহি লি’র প্রতিবছর দুইবার মিয়ানমার সফরের কথা।

চলতি বছরের জানুয়ারি ও জুলাইয়ে মিয়ানমার সফরের পাশাপাশি ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে সফর করে কক্সবাজারের রোহিঙ্গাদের দেখে যান তিনি। মার্চেই এই দূতের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ায় জাতিসংঘ।

প্রসঙ্গত, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ফেরত, পুনর্বাসন ও পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেই দুদেশের মধ্যে গঠিত যৌথ কমিটি জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থাসহ (ইউএনএইচসিআর) জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থাকে যুক্ত রাখবে বলে আলোচনা হয়।

এ প্রসঙ্গে কূটনীতি বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমেদ বেনারকে বলেন, “১৯৯২ সাল থেকেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে রয়েছে। মিয়ানমারের সাম্প্রতিক আচরণও বলছে না এই প্রক্রিয়া সফল হবে। সুতরাং তারা কোনোভাবেই জাতিসংঘকে সম্পৃক্ত করতে চাইবে না-এটাও এখন পরিস্কার।”

মিয়ানমারকে আড়াই কোটি ডলার দেবে ভারত

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য ভারত মিয়ানমারের সাথে আড়াই কোটি ডলার সহায়তার একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে বলে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

এতে বলা হয়, আগামী পাঁচ বছরে মিয়ানমার ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য বাড়িঘর, সড়ক ও স্কুল নির্মাণ এবং স্বাস্থ্যসেবায় এই অর্থ ব্যবহার করা হবে।

প্রসঙ্গত গত বুধবার মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোতে দেশটির স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি ও সেনাবাহিনী প্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং লায়েংয়ের সঙ্গে উত্তর রাখাইনের পরিস্থিতি নিয়ে আলাদাভাবে বৈঠক করেছেন দেশটিতে সফররত ভারতের পররাষ্ট্রসচিব এস জয়শঙ্কর।

প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন কক্সবাজার থেকে আবদুর রহমান

মন্তব্য (0)

সব মন্তব্য দেখুন.

মন্তব্য করুন

নিচের ঘরে আপনার মন্তব্য লিখুন। মন্তব্য করার সাথে সাথে তা প্রকাশ হয় না। একজন মডারেটর অনুমোদন দেবার পর মন্তব্য প্রকাশিত হয়। বেনারনিউজের নীতিমালা অনুসারে প্রয়োজানে মন্তব্য সম্পাদনা হতে পারে। প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য বেনারনিউজ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয়বস্তুর সাথে প্রাসঙ্গিক থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন