রোহিঙ্গা শিবিরে দুই মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত দেড় হাজারের বেশি

কামরান রেজা চৌধুরী ও সুনীল বড়ুয়া
2022.07.01
ঢাকা ও কক্সবাজার
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
রোহিঙ্গা শিবিরে দুই মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত দেড় হাজারের বেশি কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু আক্রান্ত এক রোহিঙ্গা শিশু। ৩০ জুন ২০২২।
[সুনীল বড়ুয়া/বেনারনিউজ]

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। গত ছয় মাসে শিবিরে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় দুই হাজার শরণার্থী।

মোট আক্রান্তদের মধ্যে মে ও জুন মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন এক হাজার ৫৫৪ জন।

গত মঙ্গলবার ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে এক রোহিঙ্গা শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে বেনারকে জানিয়েছেন কক্সবাজার সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের চিকিৎসক ডা. আব্দুল মজিদ।

চার বছর বয়সী ওই শিশুর নাম জিসমা আক্তার। পিতার নাম কলিমউল্লাহ। এটিই রোহিঙ্গা শিবিরে ডেঙ্গুতে প্রথম কোনো মৃত্যু বলে ডা. মজিদ জানান।

রোহিঙ্গা শিবিরকে এখন ডেঙ্গুর হটস্পট বলছেন সেখানকার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা।

বিষয়টি বেশ উদ্বেগজনক জানিয়ে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোমিনুর রহমান বেনারকে বলেন, “একদিকে খুব ঘনবসতি, অন্যদিকে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, অপ্রতুল খাবার, পরিবেশ ও অবস্থানগত কারণে রোহিঙ্গা শিবিরে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্তের হার দিন দিন বাড়ছে।”

রোহিঙ্গা শিবিরের পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মাঝেও ডেঙ্গু ব্যাপকভাবে ছড়াতে পারে-এমন আশঙ্কার কথা জানিয়ে ডা. মোমিনুর রহমান বলেন, “রোহিঙ্গা শিবির থেকে শুধুমাত্র জটিল রোগীদের কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। অন্য রোগীদের ক্যাম্পভিত্তিক হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।”

জুন মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১৩ শিশুর মধ্যে ১১ জনই রোহিঙ্গা শিশু বলে বেনারকে জানান শিশু ওয়ার্ডের চিকিৎসক ডা. আব্দুল মজিদ।

তিনি বলেন, “জ্বর কমার পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টা বিপজ্জনক সময়। এই সময়ে প্লাজমা লিকেজ শুরু হয়। প্লাজমা লিকেজ শুরু হলে দ্রুত রোগীর রক্তচাপ কমতে থাকে এবং পেটে, বুকে ও হৃদপিণ্ডের আবরণীর ভেতরে পানি জমে যায়।”

দ্রুত চিকিৎসা না পেলে ডেঙ্গু রোগীর একে একে কিডনি, লিভার ও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হওয়া শুরু করে জানিয়ে এই চিকিৎসক বলেন, যে কারণে ডেঙ্গু রোগীর সুস্থতার জন্য জরুরি ভিত্তিতে যথাযথ চিকিৎসা সেবা প্রয়োজন।

প্রায় প্রতিদিনই রোহিঙ্গা শিবির থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুরা শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, “শিবিরগুলোতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে জরুরী ভিত্তিতে ব্যবস্থা না নিলে এর ভয়াবহতা বাড়বে।”

এদিকে অন্য বছরের তুলনায় রোহিঙ্গা শিবিরে এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্তের হার অনেক বেশি বলে বেনারকে জানান কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ের চিকিৎসা সমন্বয়ক ডা. আবু তোহা।

তিনি বলেন, এ বছর পহেলা জানুয়ারি থেকে ১৯ জুন পর্যন্ত রোহিঙ্গা শিবিরে এক হাজার ৮২১ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে।

“তবে আশার বিষয় হচ্ছে, যারা আক্রান্ত হচ্ছেন সবাই চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে যাচ্ছেন। মৃত্যুর হার নেই বললেই চলে,” যোগ করেন ডা. তোহা।

অধিদপ্তরের হেলথ জরুরি অপারেশনস কেন্দ্র ও নিয়ন্ত্রণ কক্ষের তথ্য অনুসারে, দেশে মে-জুন মাসে সারা বাংলাদেশে ৮৬২ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। তবে কোনো মৃত্যু হয়নি।

জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্লুগবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথ, সেন্টার ফর হেলথ সিকিউরিটি এবং আউটব্রেক অবজারভেটরির তথ্য অনুসারে ডেঙ্গু জ্বরের কারণ ডিঙ্গি/ডেঙ্গু নামক একটি ভাইরাস। এডিস মশা এই ভাইরাস মানবদেহে বহন করে।

বাংলাদেশে ডেঙ্গু রোগ প্রথম দেখা দেয় ১৯৬৪ সালে। তবে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশের চেয়ে বাংলাদেশে এই রোগের হার খুব কম ছিল।

সংস্থাটির মতে, প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমারে ডেঙ্গু রোগের বিস্তার বেশি। সেকারণে বাংলাদেশে ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের সম্ভাবনা বেশি।

২০০২-০৩ সালে বাংলাদেশে ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। এর পরে ২০১৭ সালে পুনরায় বাংলাদেশে ডেঙ্গু রোগ দেখা দেয়। ওই বছর দুই হাজার ৭৬৯ জন রোগী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। পরের বছর সেই সংখ্যা বেড়ে হয় ১০ হাজার ১৪৮।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ১০ গুণ বৃদ্ধি পায়; সেই বছর এক লাখ এক হাজার ৩৫৪ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হন এবং ১৭৯ জন প্রাণ হারান।

রোহিঙ্গা শিবিরে ডেঙ্গুর বিস্তার ‘আশঙ্কার বিষয়’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও প্রধান ড. নজরুল ইসলাম বেনারকে বলেন, “ডেঙ্গুর প্রকোপ মূলত শহরাঞ্চলে বিশেষ করে ঢাকায় বেশি। কিন্তু রোহিঙ্গা শিবিরে ডেঙ্গুর বিস্তার সত্যিই আশঙ্কার বিষয় হতে পারে।”

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “রোহিঙ্গা শিবিরে মানুষগুলো কষ্টের মধ্যে গাদাগাদি করে থাকেন। সেখানে জলাবদ্ধতা বেশি। এ ছাড়া, ফেলা দেয়া প্লাস্টিকের বোতল, পাত্র, ভাঙা পাতিল, ডাবের খোসা ইত্যাদি যত্রতত্র পড়ে থাকে। ওখানে এডিস মশা বংশ বিস্তারের সুযোগ পায়।”

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার কার্যালয়ের চিকিৎসা সমন্বয়ক ডা. আবু তোহা বলেন, জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং অবস্থানগত কারণে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে এডিস মশার প্রজননের সুযোগ বেশি, এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্য শিক্ষা বা সচেতনতার অভাব থাকাতে আক্রান্তের হার বাড়ছে।

প্রতিটি শিবিরে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়, জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ, আইএনজিও, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা সমন্বিতভাবে করোনা, ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়াসহ বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে কাজ করছে বলে জানান তিনি।

তিনি জানান, সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের মাঝে কাউন্সেলিং, জলাশয় পরিষ্কার করাসহ সচেতনতামূলক নানা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার বেনারকে বলেন, কীটনাশক দিয়ে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে।

তাঁর মতে, মশার লার্ভা নষ্ট করতে পারলেই ৮০ শতাংশ ফল পাওয়া যায়। জুলাই থেকে অক্টোবর—এই চার মাস জোরালো পদক্ষেপ নিলেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন