Follow us

ফের ব্যর্থ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া

আবদুর রহমান ও শরীফ খিয়াম
টেকনাফ, ঢাকা
2019-08-22
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
টেকনাফের শালবাগান রোহিঙ্গা শিবিরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনের কর্মকর্তারা। ২২ আগষ্ট ২০১৯।
টেকনাফের শালবাগান রোহিঙ্গা শিবিরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনের কর্মকর্তারা। ২২ আগষ্ট ২০১৯।
ছবি: আবদুর রহমান/ বেনারনিউজ

মিয়ানমারের ছাড়পত্র পাওয়া এক হাজার ৩৭টি পরিবারের তিন হাজার ৫৪০ রোহিঙ্গার রাখাইনে ফিরতে রাজি না হওয়ায় - বহুল প্রচারিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের দ্বিতীয় উদ্যোগটিও ব্যর্থ হয়েছে।

এর মধ্যে ৩৩৯ পরিবার গত তিন দিনে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর) এবং বাংলাদেশের শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) প্রতিনিধিদের আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের অনাগ্রহের কথা জানিয়েছে।

পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার শালবন শরণার্থীশিবির থেকে তাদের ফেরত পাঠানো শুরু হওয়ার কথা ছিল। সকাল নয়টা থেকে ওই ক্যাম্পের বাইরে পাঁচটি বাস, দুটি ট্রাক এবং ভেতরে ১০টি মাইক্রোবাস মজুত রাখা হয়।

“কিন্তু বিকেল চারটা পর্যন্ত একজনও রাজি না হওয়ায় প্রত্যাবাসন শুরু করা যায়নি। শনিবার থেকে আবারও তালিকাভুক্তদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ শুরু হবে ” বেনারকে বলেন ক্যাম্প-ইন-চার্জ মোহাম্মদ খালিদ হোসেন।

শর্তহীনভাবে ফিরতে রাজি নয় রোহিঙ্গারা

বাংলাদেশের শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ আবুল কালাম সাংবাদিকদের জানান, রোহিঙ্গাদের কেউই শর্তহীনভাবে স্বদেশে ফেরত যেতে রাজি নন। তবুও তালিকাভুক্ত সবগুলো পরিবারের মতামত নেওয়া শেষ হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিনই গাড়িগুলোকে প্রস্তুত রাখা হবে।

চীন, মিয়ানমার এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরাও আরআরআরসির সাথে ছিলেন। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শালবাগান শরণার্থীশিবিরে এসে তাঁরা তালিকাভুক্ত রোহিঙ্গা নারী-পুরুষের সঙ্গে কথা বলেন।

পরে আরআরআরসি আবুল কালাম বলেন, “যে কোনো সময় পরিস্থিতি পাল্টে যেতে পারে। যে লক্ষ্যে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আলোচনাটা অব্যাহত রাখা হবে।”

তিনি বলেন, মিয়ানমার সরকার এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে ফারাক হয়ে গেছে, সেটি যাতে আমরা সকলে মিলে ঘোচাতে পারি, সেই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।”

তাঁর দাবি, “এখানে বাংলাদেশের ব্যর্থ হওয়ার কোনো ক্ষেত্র এখানে নেই। এ সমস্যাটা মিয়ানমার এবং তাদের জনগোষ্ঠীর।”

কক্সবাজারে অবস্থানকারী রোহিঙ্গারা বারবার জানিয়েছে, রাখাইনের আইডিপি (ইন্টারন্যালি ডিসপ্লেসড পার্সনস) ক্যাম্পে বন্দী রোহিঙ্গাদের মুক্তি না দেওয়া হলে তারা ফিরবে না।

এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে এই কর্মকর্তা বলেন, “আমরা বিশ্বাস করতে চাই যে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে ওয়াকিবহাল আছেন।”

“তাদের প্রতিনিধিরা যখন এসেছিলেন তাদের সামনেও রোহিঙ্গা নেতারা এই দাবি তুলেছিলেন। আলোচনায় এ নিয়ে কথা বলা হয়েছে। নিশ্চয়ই মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এই সমস্যা সমাধানে একটা কাজ করবেন,” যোগ করেন আরআরআরসি।

আরআরআরসি বেনারকে বলেন, “আমরা ধারণা করেছিলাম, রোহিঙ্গারা যেতে অস্বীকৃতি জানাতে পারে। তবুও মিয়ানমার যেহেতু আমাদের জানিয়েছে যে তারা এই বাস্তুচ্যুতদের গ্রহণ করতে প্রস্তুত রয়েছে, সেহেতু আমরা প্রত্যাবাসনের জন্য দ্বিতীয়বারের মতো চেষ্টা করেছি।”

“শরণার্থীরা যেতে চায় কিনা - তা আমরা জানার চেষ্টা করেছি। এটা না করলে মিয়ানমার তখন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ তুলতো। আমরা মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে সহায়তা অব্যাহত রাখতে চাই,” যোগ করেন তিনি।

চেষ্টা অব্যাহত রাখবে বাংলাদেশ

এদিকে ঢাকায় দুপুর আড়াইটার দিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন সাংবাদিকদের বলেন, “প্রত্যাবাসনের জন্য কাউকে না পাওয়াটা দুঃখজনক। তবে প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়নি, ভবিষ্যতেও চলবে। কাউকে পাওয়া গেলেই পাঠানো হবে।”

“যারা প্রত্যাবাসন ঠেকাতে প্রচার চালিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রোহিঙ্গাদের আরামের জীবন থেকে আরাম কমানো হবে, যাতে তারা ফিরতে রাজি হয়,” যোগ করেন তিনি।

প্রত্যাবাসন বিরোধী কর্মকাণ্ড রোহিঙ্গাদের

অন্যদিকে রোহিঙ্গারা প্রত্যাবাসন বিরোধী বিচ্ছিন্ন কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছে। শালবন সংলগ্ন নয়াপাড়া শিবিরে লেদা ও জাদিমুরা ক্যাম্পের হেড মাঝি, চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের রোহিঙ্গা নেতারা জড়ো হয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছেন।

মিয়ানমারের তালিকাভুক্তদের মধ্যে ৬২৬ জনের সাক্ষর ও টিপসই সংগ্রহ করে দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেছেন, আমাদের সাথে আলোচনা না করে প্রত্যাবাসন শুরু হতে পারে না।

প্রথম দফায় গত বছরের ১৫ নভেম্বর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের শুরুর দিন ঠিক হয়েছিল। রোহিঙ্গারা রাজি না হওয়ায় তখনো কাউকে ফেরত পাঠানো যায়নি।

সর্বশেষ গত ১৬ আগস্ট মিয়ানমারের সরকারি মুখপাত্র জানায়, ২২ আগস্ট থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন শুরু হচ্ছে এবং তারা কক্সবাজার থেকে তিন হাজার ৫৪০ জনতে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছেন।

 

 

 

আশাবাদী চীন, নিরুত্তর মিয়ানমার

প্রত্যাবাসন শুরুর সাক্ষী হতে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হাজির হওয়া চীন ও মিয়ানমারের ঢাকাস্থ দূতাবাসের কর্মকর্তাদেরও সামলাতে হয়েছে সাংবাদিকদের প্রশ্নবাণ। যার প্রেক্ষিতে চীনের এক কূটনীতিক মুখ খুললেও, নিরুত্তর ছিলেন মিয়ানমারের প্রতিনিধি।

এক প্রশ্নের জবাবে চীন দূতাবাসের রাজনৈতিক শাখার পরিচালক ঝেং তিয়ানজুও বলেন, “প্রত্যাবাসন যেকোনো দিনই শুরু হতে পারে, যে সময় তারা (রোহিঙ্গারা) চাইবে বা প্রস্তুত হবে। আমরা মনে করি, এটি একটি যুগপৎ প্রক্রিয়া।”

রাখাইনে ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার রক্ষা, সেখানে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গণমাধ্যমকে প্রবেশের সুযোগ সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে নিরুত্তর ছিলেন উপস্থিত মিয়ানমার দূতাবাসের প্রতিনিধি।

তবে ঝেং তিয়ানজুও বলেন, “এ ব্যাপারে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে আমাদের উচিত মিয়ানমার এবং বাংলাদেশ  সরকারকে সাহস দেওয়া।”

গত জুলাইয়ে শরণার্থীশিবিরে মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলের সফরকে প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে তাদের আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ উল্লেখ করে তিনি বলেন, “রোহিঙ্গাদের সাথে যে সংলাপ শুরু করেছে, তা প্রত্যাবাসনের জন্য সহায়ক হবে।”

আশ্বাস দেওয়া সত্ত্বেও রোহিঙ্গা নেতাদের সাথে পুনরায় সংলাপে না বসে প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে ঝেং তিয়ানজুও বলেন, “বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অবস্থানকাল লম্বা হতে থাকলে তা কোনোপক্ষের জন্যই সুখকর হবে না।”

আরআরআরসি বেনারকে বলেন, “আমরা ধারণা করেছিলাম, রোহিঙ্গারা যেতে অস্বীকৃতি জানাতে পারে। তবুও মিয়ানমার যেহেতু আমাদের জানিয়েছে যে তারা এই বাস্তুচ্যুতদের গ্রহণ করতে প্রস্তুত রয়েছে, সেহেতু আমরা প্রত্যাবাসনের জন্য দ্বিতীয়বারের মতো চেষ্টা করেছি।”

“শরণার্থীরা যেতে চায় কিনা তা আমরা জানার চেষ্টা করেছি। এটা না করলে মিয়ানমার তখন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ তুলতো। আমরা মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে সহায়তা অব্যাহত রাখতে চাই,” যোগ করেন তিনি।

ইউএনএইচসিআরের বিবৃতি

উদ্ভুত পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে ইউএনএইচসিআর বলেছে, রাখাইন রাজ্যে সংশ্লিষ্ট অঞ্চল বা এলাকায় তাদের পাশাপাশি জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) প্রত্যাশিত এবং কার্যকর প্রবেশাধিকার জরুরি।

সংস্থাটি মনে করছে, স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসন শরণার্থীদের আস্থা তৈরি করতে সংশ্লিষ্ট সকলের অবিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা প্রয়োজন । এটি এমন একটি প্রক্রিয়া, যা একপাক্ষিক নয় ।

ইউএনএইচসিআর এই প্রক্রিয়ায় দুই দেশের সরকারকে সমর্থন করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে বিবৃতিতে।

এদিকে জাতিসংঘের একটি স্বাধীন ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এই প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর মিয়ানমার নিরাপত্তাবাহিনী কর্তৃক ব্যাপক মাত্রার  যৌন নির্যাতনের কথা বলা হয়েছে।

প্রতিবেদন আরও বলা হয়, এটা প্রতীয়মান হয়েছে যে, মিয়ানমারের সৈন্যরা রোহিঙ্গা নারী শিশু, বালক, পুরুষদের উপর  '' ক্রমাগত ও সুপরিকল্পিত যৌন নিপীড়ন চালিয়েছে যেটা আন্তজার্তিক মানবাধিকারের লংঘন''।

রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে গত বুধবার জাতিসংঘের সিকিউরিটি কাউন্সিল একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হয়েছে।  যদিও এ বিষয়ে কোনো প্রেস বিজ্ঞপ্তি  বা কোনো বক্তব্য প্রকাশ করেনি তারা।  বৈঠকের বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য বেনার নিউজের পক্ষ থেকে তাদের প্রেস অফিসারের সাথে  ই মেইল এবং ফোনে যোগাযোগ করা হয়। , কিন্তু এখন পর্যন্ত এর কোনো তাৎক্ষণিক উত্তর পাওয়া যায় নি।

বিশ্লেষকরা যা বলছেন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন বেনারকে বলেন, “দুই-তিন হাজার রোহিঙ্গা নিয়ে একটা প্রতীকী প্রত্যাবাসনের প্রস্তুতি হয়তো তাদের আছে। কিন্তু প্রকৃত, মানে বড় আকারের প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমার একেবারেই প্রস্তুত নয়।”

“আগে দেখতে হবে মিয়ানমারের ভিতরে আসলেই তাদের যাওয়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে কিনা। জানা গেছে, রাখাইনে চীন-ভারত সেখানে কিছু ক্যাম্প তৈরি করেছে। তবে সেগুলো কতটা নিরাপদ, তা কিন্তু বোঝা যাচ্ছে না,” বলেন তিনি।

এই আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকের দাবি, “মিয়ানমার সরকারের কাছ থেকে রোহিঙ্গাদের যে প্রত্যাশা, প্রত্যাবাসনের এই উদ্যোগ তার একদমই বিপরীতমুখী অবস্থানের।”

“মিয়ানমার তাদের যেনতেনভাবে নিয়ে যেতে চাইছে, আর রোহিঙ্গারা চাইছে অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি অধিকার বুঝে নিয়ে ফিরতে,” যোগ করেন তিনি।

তাঁর মতে, “বাংলাদেশ থেকে একজন রোহিঙ্গা গেলেও আমাদের ওপর দিয়ে একটু চাপ কমে। যে কারণে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় ছোট ছোট আকারে হলেও তাদের পাঠানোর চেষ্টা অব্যাহত রাখতেই হবে।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন