Follow us

৫৪ হাজার রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট দিতে বলছে সৌদি

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2020-09-23
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
সৌদি আরবে যাওয়ার বিমানের টিকেটের দাবীতে বিক্ষোভ করছেন সৌদি প্রবাসীরা। ছবি: ফোকাস বাংলা
সৌদি আরবে যাওয়ার বিমানের টিকেটের দাবীতে বিক্ষোভ করছেন সৌদি প্রবাসীরা। ছবি: ফোকাস বাংলা
ছবি: ফোকাস বাংলা

সৌদি আরবে অবস্থানরত ৫৪ হাজার অবৈধ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেওয়ার জন্য সে দেশের সরকার চাপ দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন।

বুধবার নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের জানান, ওই রোহিঙ্গারা ৩০ থেকে ৪০ বছর ধরে সৌদি আরবে অবস্থান করছেন। সৌদি আরব সরকার নিজেই তাদের অনেককে সে দেশে নিয়ে গিয়েছিল।

মন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট না দিলে সেখানে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানোর হুমকিও দেওয়া হচ্ছে।

“সৌদি আরবের তৎকালীন বাদশা স্বপ্রণোদিত হয়ে এবং রোহিঙ্গাদের দুর্দশা দেখে ৮০ ও ৯০-এর দশকে অনেক রোহিঙ্গাকে নিয়ে গেছে। অনেকে সরাসরি গেছে। কেউ কেউ হয়তো বাংলাদেশ হয়ে গেছে,” বলেন আবুল মোমেন।

তিনি বলেন, সৌদি সরকার জানিয়েছে যে সেখানে ৫৪ হাজার রোহিঙ্গা বসবাস করছে।

মন্ত্রী জানান, “তারা বলছে, এদের পাসপোর্ট নেই এবং কোনও বৈধ কাগজ নেই। তারা আরও বলছে, এদের তোমরা পাসপোর্ট ইস্যু করো। আমরা বলেছি, যারা আগে পাসপোর্ট পেয়েছে এবং তাদের পাসপোর্টের কাগজ যদি থাকে তবে আমরা নতুন পাসপোর্ট ইস্যু করবো। কিন্তু এরা যদি আমাদের লোক না হয়, তবে আমরা নেবো না।”

রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট না দেয়া হলে অন্য বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানো হবে বলে হুমকি দেওয়া হচ্ছে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, “জুনিয়র লেভেলে কেউ কেউ বলছে, তোমরা যদি এদের না নাও বা পাসপোর্ট ইস্যু না করো তবে তোমাদের দেশ থেকে এত লোক আনছি, এটা আমরা বন্ধ করে দেবো এবং  তোমাদের যে ২২ লাখ লোক আছে তাদের সম্পর্কে নেতিবাচক অবস্থান নেবো। এই কথাগুলি জুনিয়র লেভেল থেকে আমাদের বলা হয়েছে। কিন্তু আমার মনে হয় এটি সরকারের সিদ্ধান্ত নয়।”

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্যের ব্যাপারে বেনারের পক্ষ থেকে বুধবার ঢাকাস্থ সৌদি দূতাবাসে ই-মেইল পাঠানো হলেও কোন জবাব পাওয়া যায়নি।

সাবেক পররাষ্ট্রসচিব তৌহিদ হোসেন বেনারকে বলেন, “প্রথম কথা হলো, পররাষ্ট্রমন্ত্রী যখন বলেছেন তখন ধরে নেয়া যায় যে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে ৫৪ হাজার রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেয়ার জন্য বাংলাদেশকে চাপ দিচ্ছে।”

তিনি বলেন, “কেন চাপ দিচ্ছে? আমি মনে করি সৌদিরা আমাদের ওপর চাপ দেয়ার একটি যৌক্তিক কারণ আছে। কারণটি হলো, সৌদি আরবে যেসব রোহিঙ্গা গেছে, তাদের একটি বড় অংশ আশির দশকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়েই গেছে। সৌদি সরকারের অনুরোধেই বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট দিয়েছে।”

তৌহিদ হোসেন বলেন, “সৌদি আরব এখন এসব রোহিঙ্গার পাসপোর্ট ইস্যু করতে বাংলাদেশকে বলছে। তারা বলছে না যে তারাই রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট ইস্যু করতে বাংলাদেশকে অনুরোধ করেছিল, যাতে তারা মিয়ানমারে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের তাদের দেশে নিয়ে যেতে পারে।”

তিনি বলেন, “আসলে ভুলটি আমাদের। সৌদিদের কথা শুনে রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট দেয়ার সিদ্ধান্ত ছিল মারাত্নক ভুল।”

সাবেক এই পররাষ্ট্রসচিব বলেন, “আমি মনে করি, কোনওক্রমেই ৫৪ হাজার রোহিঙ্গার বাংলাদেশি পাসপোর্ট নবায়ন করা ঠিক হবে না। যদি করা হয় তবে মিয়ানমারকে আমাদের বিরুদ্ধে আরেকটি অস্ত্র তুলে দেয়া হবে। মিয়ানমার তখন বলবে যে, রোহিঙ্গারা যদি অবৈধ বাংলাদেশি না হয় তাহলে তারা বাংলাদেশি পাসপোর্ট দিলো কেন?”

তিনি বলেন, “তাই সরকারের উচিত সৌদিরা যতই চাপাচাপি করুক না কেন রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট না দেয়া।”

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ১৯৭৮ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন শুরু হলে তাদের সৌদি আরব নিয়ে যেতে আগ্রহ প্রকাশ করেন তৎকালীন বাদশা। কিন্তু রোহিঙ্গাদের তখন কোনও পাসপোর্ট ছিলো না।

সৌদি বাদশার অনুরোধে পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হক এবং বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট দিতে রাজি হন।

তবে পাকিস্তান পাসপোর্টে ইংরেজি বিএম সিরিজ দেয়। বিএম অর্থ ছিল, বার্মিজ মুসলিম। পরে পাকিস্তান সেই রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট নবায়ন করেনি।

কিন্তু বাংলাদেশ তেমন কোন সিরিজ না দিয়ে বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেয়। ফলে রোহিঙ্গাদের আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

১৯৯১ সালে দ্বিতীয় দফা রোহিঙ্গা নিপীড়ন শুরু হলে অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে সৌদি আরব যায়। ২০০৯ সালের দিকে বাংলাদেশ দূতাবাস বাংলাদেশি পাসপোর্টধারি রোহিঙ্গাদের চিহ্নিত করতে শুরু করে।

যেসব বাংলাদেশি পাসপোর্টধারি বাংলাদেশে রেমিটেন্স পাঠায়নি তাদের চিহ্নিত করে দেখা যায়, তারা সবাই রোহিঙ্গা। সে কারণে তাদের পাসপোর্ট নবায়ন করা থেকে বিরত থাকে বাংলাদেশ।

আটকে পড়া প্রবাসীদের সমস্যা মিটেছে

করোনাভাইরাসের কারণে বাংলাদেশে এসে আটকা পড়েছেন কয়েক হাজার প্রবাসী।

তিন দফা বৃদ্ধির পরও অধিকাংশ প্রবাসীর কাজের অনুমতি শেষ হচ্ছে ৩০ সেপ্টেম্বর।

এমন পরিস্থিতিতে ৩০ সেপ্টেম্বরের পর ইকামার মেয়াদ আরও তিন মাস বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়ে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে চিঠি পাঠায় সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস।

বাংলাদেশে আটকা পড়া প্রবাসীরা বুধবারও টিকেটের দাবিতে রাজধানীর কাওরানবাজারে সৌদি এয়ারলাইন্সের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন। এ নিয়ে টানা তিন​ দিন তাঁরা ঢাকায় বিক্ষোভ করল।

বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা জানান, ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সৌদি আরব ফিরে না গেলে তাদের কাজের অনুমতি বাতিল হয়ে যাবে। তাই, তারা যাওয়ার টিকিট এবং ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ চান।

বুধবার কাওরানবাজার থেকে বিক্ষুদ্ধ সৌদি প্রবাসীরা মিছিল করে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ঘেরাও করে।

প্রবাসীদের পক্ষে কয়েকজন প্রবাসী তাঁর সাথে দেখা করে প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিমান পরিচালনাসহ বিভিন্ন দাবি পেশ করেছে বলে বেনারকে নিশ্চিত করেছেন মন্ত্রী ইমরান আহমদ।

তিনি বলেন, “আমি আটকে পড়া প্রবাসীদের বলেছি, সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের সমস্যার কথা জানানো হয়েছে। আশা করি এ ব্যাপারে দ্রুত সমাধান আসবে। তবে কিছুটা ধৈর্য্য ধরতে হবে।”

তিনি বলেন, “প্রবাসীদের ভ্রমণের জন্য বাংলাদেশ বিমান ও সৌদি এয়ারলাইন্স প্রয়োজনীয় সংখ্যক ফ্লাইট পরিচালনা করবে।”

মন্ত্রী বলেন, “যদি কোন প্রবাসীর ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যায় তবে সেক্ষেত্রে তারা ঢাকাস্থ সৌদি দূতাবাস থেকে ভিসা নিতে পারবেন। আর আকামার মেয়াদ আরও ২৪ দিন থাকবে।”

বুধবারই প্রবাসী শ্রমিকদের সমস্যা সমাধানে আন্ত:মন্ত্রণালয় সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমদ।

এদিকে সাত বছর পরে সৌদি আরব আবার বাংলাদেশ থেকে লোক নেওয়া শুরু করেছে বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

বুধবার রাতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন বেনারকে বলেন, “সৌদি কর্তৃপক্ষ আজকে আমাদের জানিয়েছে যে, বাংলাদেশে আটকে পড়া প্রবাসীরা সৌদি আরব যেতে পারবেন। সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে বলা যায়।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন