সৌদি আরবের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি: স্থলমাইন তুলবে বাংলাদেশের সেনারা

কামরান রেজা চৌধুরী
2019.02.14
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
190214-BD-saudi-620.jpg ইয়েমেনের সাআদা এলাকায় সৌদি জোটের বিমান হামলায় বিধ্বস্ত একটি বাস। ১২ আগস্ট ২০১৮।
[এপি]

সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় সামনে রেখে সৌদি আরবের সাথে প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ।

বৃহস্পতিবার সৌদি রাজধানী রিয়াদে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে ‘ডিফেন্স কো-অপারেশন বিটুইন বাংলাদেশ অ্যান্ড সৌদি অ্যারাবিয়া” শিরোনামে এই সমঝোতা স্বাক্ষর করেন বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লে. জেনারেল মো. মাহফুজুর রহমান এবং সৌদি আরবের পক্ষে স্বাক্ষর করেন সে দেশের সশস্ত্র বাহিনীর ডেপুটি চীফ অব স্টাফ লে. জেনারেল মুতলাক বিন সালিম আল উজাইমিয়া।

রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের উপপ্রধান ড. নজরুল ইসলাম বেনারকে বলেন, “আজ বৃহস্পতিবার প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদার হবে।”

তিনি বলেন, সমঝোতা স্মারকটি পাঁচ বছর মেয়াদি। দুপক্ষ চাইলে এর মেয়াদ বৃদ্ধি করা যাবে।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে ওই চুক্তিটি প্রকাশ করা হয়নি। এই সামরিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে বাংলাদেশের সাংবিধানিক ধারা লঙ্ঘিত হয়েছে কি না সেব্যাপারে বৃহস্পিতবার সংসদে প্রশ্ন তুলেছেন আওয়ামী লীগের শরিক দল ও সংসদে বিরোধী দলের সদস্যরা।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন বুধবার তাঁর সংসদ কার্যালয়ে বেনারকে বলেন, “চুক্তি অনুযায়ী সৌদি আরবের ইয়েমেন সীমান্তে পুঁতে রাখা স্থলমাইন অপসারণ করবে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা।”

তিনি বলেন, “আর কখনো সৌদি আরবের মক্কা-মদিনায় অবস্থিত পবিত্র দুটি মসজিদ আক্রান্ত হলে বাংলাদেশ তা রক্ষায় কাজ করবে। এর বাইরে বাংলাদেশ সামরিক কোনো কাজে অংশ নেবে না।”

মন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর স্থলমাইন অপসারণে দক্ষতা আছে। সেকারণে সৌদি আরব আমাদের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।”

তিনি বলেন, ওই সমঝোতা স্মারকের আওতায় এক হাজার ৮০০ সেনা সদস্য সৌদি আরবে কাজ করবে।

সিরিয়া-ইরাক ভিত্তিক জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের সন্ত্রাসী কার্যক্রম ঠেকাতে ইসলামী দেশগুলোকে নিয়ে সন্ত্রাস বিরোধী জোট গঠন করে সৌদি আরব। সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত ওই জোটে যোগ দেওয়ার কথা জানালেও সৌদি আরবের পক্ষে ইয়েমেন অথবা অন্য কোনো স্থানে যুদ্ধ করতে অস্বীকৃতি জানায় বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আরও জানান হয়, বাংলাদেশ সৌদি আরব অথবা ইরানের পক্ষ হয়ে অন্য কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়াবে না।

সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে প্রকাশ করা এক সংবাদ বিবৃতিতে বলা হয়, “উভয় দেশের বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ভিত্তিতে এবং পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে এই সহযোগিতা আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি করবে মর্মে এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।”

বিবৃতি অনুযায়ী, সৌদি আরব ও বাংলাদেশ এই সমঝোতা স্মারকের আওতায় সামরিক প্রশিক্ষণ, অনুশীলন ও শিক্ষা, সামরিক তথ্য ও গোয়েন্দা, প্রতিরক্ষা শিল্প, সরবরাহ ও রক্ষণাবেক্ষণ, পরিদর্শন ও দক্ষতা বিনিময়, সামরিক চিকিৎসা ও গবেষণা, ক্রীড়া, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, সামরিক সদস্যবৃন্দের বিনিময়, সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও জলদস্যু রোধ ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে।

এই সমঝোতা স্মারক সম্পর্কে সাবেক পররাষ্ট্রসচিব মোস্তফা কামাল বেনারকে বলেন, “বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কুয়েত যুদ্ধ শেষে কুয়েত থেকে খুব সফলভাবে ইরাকি সেনাবাহিনীর পুঁতে যাওয়া স্থলমাইন অপসারণ করে সমগ্র কুয়েতকে নিরাপদ করেছে। সেকারণে সারা পৃথিবীতে মাইন অপসারণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সুনাম রয়েছে।”

“মাইন অপসারণে আমাদের সেনাবাহিনীর সুনাম সৌদি আরবসহ অন্যান্য দেশ অবগত। হয়তো সেই কারণে ইয়েমেন বর্ডারে পুঁতে রাখা মাইন অপসারণের জন্য বাংলাদেশের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে সৌদি সরকার”, যোগ করেন মোস্তফা কামাল।

“এই কাজের মাধ্যমে বাংলাদেশ সৌদি আরবে বেসামরিক মানুষদের নিরাপদ করার জন্য অবদান রাখতে পারবে,” উল্লেখ করে মোস্তফা কামাল বলেন, “মাইন অপসারণ খুবই বিপজ্জনক কাজ। আমি আশা রাখি সেখানে কাজ করতে গিয়ে কেউ নিহত অথবা আহত হবেন না।”

তিনি বলেন, “তবে, সৌদি আরব ও ইয়েমেন মধ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়া ঠিক হবে না।”

মোস্তফা কামালের মতে, বাংলাদেশ সরকারের উচিত সৌদি আরবের সাথে সম্পাদিত প্রতিরক্ষা চুক্তিটি জনগণের কাছে প্রকাশ করা। কোনো দেশের সাথে সম্পাদিত চুক্তি গোপন হতে পারে না। কারণ চুক্তিগুলোর সাথে আমাদের মানুষের ভাগ্য জড়িত।

জাতীয় সংসদে বিরোধিতা

সৌদি আরবের সাথে সম্পাদিত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের বিরোধিতা করেছেন সংসদে ক্ষমতাসীন জোটের শরিক দলের সদস্যরা।

বৃহস্পতিবার ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন সংসদে বলেন, “২০১৫ সালে যখন সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটে বাংলাদেশ নাম লিখিয়েছিল তখনই আমরা বলেছিলাম বিষয়টি আমাদের জন্য কতটুকু ইতিবাচক হবে তা চুলচেরা বিশ্লেষণ করা জরুরি।”

তিনি বলেন, “সেসময় সৌদি আরব যখন এটাকে সামরিক জোট বলেছিল। আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইনিয়ে-বিনিয়ে সেটাকে বলেছিল এটা হচ্ছে একটি সন্ত্রাস বিরোধী সমন্বিত জোট।”

মেনন বলেন, “চুক্তিটি স্বাক্ষরের মাধ্যমে আমাদের সংবিধানের ২৫ বিধি লঙ্ঘিত হচ্ছে কি না সেটা অবশ্যই পরীক্ষা করা প্রয়োজন।”

তিনি বলেন, “আমরা জানি ইয়েমেনে আজকে সৌদি আরব-যুক্তরাষ্ট্র মিলে প্রতি মুহূর্তে আক্রমণ চালাচ্ছে হুতি বিদ্রোহীদের প্রতিহত করার জন্য। …জাতিসংঘের মহাসচিব স্পষ্ট করে বলেছেন, ইয়েমেনের ঘটনা হচ্ছে এখন পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ মানবিক বিপর্যয় । সেখানে আমাদের সেনা বাহিনী উপস্থিত হয়ে সীমান্তে মাইন অপসারণ করবে।”

“তারা কেন আজকে মাইন অপসারণের নামে সেখানে জীবন দেবে,” প্রশ্ন রেখে মেনন বলেন, “ইয়েমেনের সীমান্তে যখন আমাদের সেনাবাহিনী থাকবে তখন স্বাভাবিক ভাবেই একটি বিরোধপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টি হবে। আমাদের সংবিধানে বলা আছে, কোনো বিরোধপূর্ণ অবস্থানে বাংলাদেশ অংশ নেবে না।”

এই বিষয়গুলোকে স্পষ্ট করে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবৃতিও দাবি করেন মেনন।

এদিকে “আজ টেলিভিশনে দেখলাম একটা চুক্তি হচ্ছে, সামরিক চুক্তি,” মন্তব্য করে সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সদস্য ফখরুল ইমাম বলেন, “আলোচনা করলে কী অসুবিধা ছিল?”

“পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানতেন এই চুক্তি হবে। আমাদের না জানিয়ে, সংসদকে পাশ কাটিয়ে, পার্লামেন্টকে মূল্যহীন ভেবে, সরকারের এটা করা কতটুকু করা যুক্তিযুক্ত হয়েছে?”—প্রশ্ন রাখেন ওই সাংসদ।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন