Follow us

কিশোরীর বয়স ২৬ দেখিয়ে সৌদিতে পাচার: গ্রেপ্তার ২

শরীফ খিয়াম ও জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2020-09-17
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
এমএইচ ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের মালিক মো. মকবুল হোসেন ও তাঁর সহযোগী মো. পারভেজকে আটক করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ান (র‌্যাব)।  ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০।
এমএইচ ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের মালিক মো. মকবুল হোসেন ও তাঁর সহযোগী মো. পারভেজকে আটক করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ান (র‌্যাব)। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০।
সৌজন্যে: র‌্যাব-৩

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ১৪ বছরের কিশোরী উম্মে কুলসুমকে ২৬ বছর বয়স দেখিয়ে সৌদি আরবে পাচারের ঘটনায় ঢাকায় রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকসহ দুইজনকে আটক করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ান (র‌্যাব)। সৌদি নিয়োগকর্তার নির্যাতনে নিহত এই কিশোরীর মরদেহ গত ১১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে আসে।

এমএইচ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামে সংশ্লিষ্ট এজেন্সির মালিক মো. মকবুল হোসেনকে বৃহস্পতিবার দুপুরে ফকিরাপুলের ডিআইটি রোডের তাঁর অফিসে অভিযান চালিয়ে আটক করা হয়। গ্রেপ্তার হওয়া অপরজন মকবুলের সহযোগী মো. পারভেজ। অভিযান শেষে অফিসটি সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে বলে বেনারকে জানিয়েছেন র‌্যাব-৩ এর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ কুমার বসু।

“সৌদি আরবে কাজে যাওয়ার ন্যূনতম বয়স ২৫ হলেও কুলসুমের বয়স ছিল ১৫ বছরের কম। কিন্তু স্থানীয় দালাল ও এমএইচ ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের মালিক মকবুল হোসেনের প্ররোচনায় তাঁর বয়স ২৬ বছর দেখিয়ে পাসপোর্ট তৈরি করা হয়,” বলেন তিনি।

কুলসুমের জন্ম তারিখ উল্লেখ রয়েছে এমন একাধিক নথির অনুলিপি বেনারের হাতে এসেছে। এর মধ্যে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের থেকে নেওয়া জন্মসনদ এবং ২০১৯ সালের মার্চে ইস্যু হওয়া পাসপোর্টে তাঁর জন্ম তারিখ ১৩ মার্চ ১৯৯৩ লেখা রয়েছে।

তবে ২০১৭ সালের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার সনদ অনুযায়ী তাঁর জন্ম ২০০৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর।

কুলসুমের বৃদ্ধ পিতা শহিদুল ইসলাম বেনারকে জানান, ২০০৬ সালেই তাঁর জন্ম। স্থানীয় দালাল এবং রিক্রুটিং এজেন্সি তাঁর বয়স বাড়িয়ে দেখিয়ে পাসপোর্টসহ অন্যান্য কাগজপত্র তৈরি করে দিয়েছে।

এজেন্সির মালিক গ্রেপ্তারের খবরে খুশি হলেও তিনি বলেন, “স্থানীয় দালাল রাজ্জাক মিয়া এখন পর্যন্ত গ্রামেই আছে। এলাকার সবাই জানে এক নিকটাত্মীয়ের বাড়িতে আত্মগোপন করে আছে সে। অথচ তাঁকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না ।”

রাজ্জাক মিয়ার প্ররোচনায় ৩০ হাজার টাকা খরচ করে মেসার্স এমএইচ ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে ২০১৯ সালের ৭ এপ্রিল সৌদি আরব গিয়েছিল কুলসুম।

কুলসুমের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার গোকর্ণ ইউনিয়নের নূরপুর গ্রামে। তহশীলদার (ভূমি সহকারী কর্মকর্তা) হিসেবে ২০০১ সালে অবসর নেওয়া শহিদুল ও নাসিমা বেগমের তিন মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে সে ছিল দ্বিতীয়।

কুলসুমকে নিযার্তনের বিষয়টি উল্লেখ করে নাসিরনগর থানায় একটি মামলা করেছে তাঁর পরিবার। এ ছাড়া জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোতে (বিএমইটি) লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। এতে কুলসুমের আট মাসের বকেয়া পারিশ্রমিক পরিশোধের দাবিও জানানো হয়েছে।

“এ ব্যাপারে বিএমইটি এখন পর্যন্ত কিছু জানায়নি,” বৃহস্পতিবার রাতে বেনারকে বলেন শহিদুল।

কুলসুমের বাবার দাবি, সৌদি আরবে গৃহকর্তা ও তাঁর ছেলের পাশবিক নির্যাতনে কুলসুমের দুই হাঁটু, কোমর ও পা ভেঙে যায় এবং তাঁর একটি চোখ নষ্ট হয়ে যায়। সৌদি পুলিশ তাঁকে রাস্তা থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার চার মাস পর ৯ আগস্ট তাঁর মৃত্যু হয়।

“হাসপাতালে ভর্তি থাকা অবস্থায় এক নার্সের মোবাইল থেকে সর্বশেষ কল করেছিলেন কুলসুম,” বেনারকে জানিয়েছেন তাঁর বাবা। নির্যাতনের কারণে কুলসুমকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করলেও দালাল বা রিক্রুটিং এজেন্সির পক্ষ থেকে কোনো সাড়া না পাওয়ার অভিযোগ তাঁর।

জড়িতদের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ

“গ্রেপ্তারকৃতরা কুলসুমকে পাচারের সঙ্গে জড়িত,” উল্লেখ করে র‌্যাবের ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ বলেন, “সৌদি আরবে গিয়ে শারীরিক-মানসিক নির্যাতন ও শ্রম শোষণের শিকার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে জানা সত্ত্বেও এমএইচ ট্রেডের মালিক মকবুল এ বিষয়ে কুলসুমকে সতর্ক না করে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে তাঁকে পাচার করেছেন।”

“কুলসুমের পরিবারের পাশাপাশি তানিয়া আক্তার নামের এক ভুক্তভোগী নারী এজেন্সিটির বিরুদ্ধে আমাদের কাছে অভিযোগ করেছিলেন। তাদের মাধ্যমে ২০১৮ সালে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন তিনি। তাঁকে হাত-পা ভেঙে ছাদ থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। দূতাবাসের কর্মকর্তারা উদ্ধার না করলে তাঁর পরিণতিও কুলসুমের মতো হতে পারতো,” বলেন এই কর্মকর্তা।

অভিযান চলাকালে তানিয়া উপস্থিত ছিলেন উল্লেখ করে পলাশ কুমার বসু বলেন, “এই এজেন্সির মাধ্যমে সৌদি গিয়ে প্রতারিত হওয়া আরো ১০-১২ জনের বিস্তারিত তথ্য আমাদের হাতে এসেছে।”

আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মানবপাচার আইনে মামলা দায়ের করার প্রস্তুতি চলছে উল্লেখ করে তিনি বেনারকে আরো জানান, মকবুলের বিরুদ্ধে ফতুল্লা থানায়ও একটি মামলা রয়েছে, যেটি বর্তমানে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত করছে।

এ জাতীয় ঘটনায় জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনার কথা জানিয়েছেন র‌্যাব কর্মকর্তারা। মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন-২০১২ এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন-২০১৩ তে অভিবাসী কর্মীর অধিকার সুরক্ষার সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও কিছু কিছু রিক্রুটিং এজেন্সি প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে বিদেশে নারী ও পুরুষ কর্মী পাঠাচ্ছে বলে অভিযোগ পেয়েছে র‍্যাব।

পুরো ‘সিস্টেমের’ ব্যর্থতা: বিশ্লেষক

“এ জাতীয় ঘটনা নতুন নয়। এর আগেও এভাবে অনেককে আটকও করা হয়েছে। কিন্তু বিষয়টি থামেনি। পরিবার থেকে শুরু করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পাসপোর্ট অফিস, বিএমইটির কর্মকর্তা, বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাসহ পুরো ‘সিস্টেমের’ (ব্যবস্থা) ব্যর্থতা এটা,” বেনারকে বলেন অভিবাসন বিশ্লেষক শরিফুল হাসান।

“এই ব্যর্থতার কারণে শুধু কুলসুম একা নয়, ২০১৬ থেকে ২০১৯ র্পযন্ত চার বছরে বিভিন্ন দেশ কাজ করতে যাওয়া ৪১০ নারী লাশ হয়ে দেশে ফিরেছেন। যার মধ্যে শুধু সৌদি আরবেই প্রাণ হারিয়েছেন ১৫৩ জন,” বলেন ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল।

তিনি জানান, “ওই ৪১০ জনের মধ্যে ৬৭ জন আত্মহত্যা করেছেন। শুধু সৌদি আরবেই আত্মহত্যা করেছেন ৩৯ জন। এর একটি ঘটনাতেও কোনো সৌদি নিয়োগ কর্তাকে শাস্তির আওতায় আনা যায়নি।”

শরিফুল হাসান বলেন, “অথচ সেখানে যাওয়ার পর এই গৃহকর্মীদের নিরাপত্তার দায়িত্ব সৌদি কর্তৃপক্ষের। এটা নিশ্চিত করা না গেলে এমন লাশের সংখ্যা বাড়তেই থাকবে।”

“গত বছরের নভেম্বরে সৌদি কর্তৃপক্ষ আশ্বাস দিয়েছিল, এমনটা আর ঘটবে না। তবুও এই বছরের আগস্টেও এমন ঘটনা আমাদের দেখতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে আমাদের দূতাবাস কী করেছে? কুলসুমকে যারা মেরে রাস্তায় ফেলে রাখলো, তাদের ব্যাপারে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চাওয়া হচ্ছে না কেন?” প্রশ্ন তোলেন তিনি।

এ ব্যাপারে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ বেনারকে বলেন, “গৃহকর্মী হিসেবে মেয়েদের বিদেশে যেতে টাকা লাগে না। যে কারণে অনেক অভিভাবক বিষয়টি ভালো করে না বুঝেই বয়স লুকিয়ে সন্তানকে বিদেশে পাঠানোর অনিয়মের ফাঁদে পা দেয়।”

“এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে,” উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, “শুধু জড়িত রিক্রুটিং এজেন্সি নয়, আরো যাদের ব্যর্থতা এ জাতীয় ঘটনার জন্ম দিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন