Follow us

শিশুদের অনলাইনে নিরাপদ রাখতে চায় ইউনিসেফ ও ফেসবুক

কামরান রেজা চৌধুরী ও শরীফ খিয়াম
ঢাকা
2018-03-30
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
শুক্রবার ফেসবুকের সহযোগিতায় ইউনিসেফ শিশু–কিশোরদের জন্য ঢাকায় নিরাপদ ইন্টারনেট বিষয়ে এক সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন আয়োজন করে। ৩০ মার্চ ২০১৮।
শুক্রবার ফেসবুকের সহযোগিতায় ইউনিসেফ শিশু–কিশোরদের জন্য ঢাকায় নিরাপদ ইন্টারনেট বিষয়ে এক সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন আয়োজন করে। ৩০ মার্চ ২০১৮।
বেনারনিউজ

ইন্টারনেট ব্যবহার করা বাংলাদেশের শিশুদের অনলাইনে নিরাপদ রাখতে জাতিসংঘ শিশু তহবিল—ইউনিসেফ ও ফেসবুক শুক্রবার দেশে প্রথমবারের সচেতনতামূলক কর্মসূচি শুরু করেছে। বছরজুড়ে এই কর্মসূচির লক্ষ্য দেশের আড়াই কোটি শিশু, তাদের অভিভাবক ও শিক্ষকদের অনলাইনে ঝুঁকির বিষয়গুলো অবগত করা।

ইউনিসেফ ও ফেসবুকের এই উদ্যোগের সাথে একমত হয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান শাহজাহান মাহমুদ শুক্রবার বেনারকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তরুণদের ‘সময় ব্যয়’ কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার চিন্তা করা যেতে পারে।

তবে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ওপর যে কোনও ধরনের নিয়ন্ত্রণ আরোপের বিরুদ্ধে।

নিরাপদ ইন্টারনেট কর্মসূচি

ঢাকার বিজয় সরণিতে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটারে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে শতাধিক স্কুলের ১০ হাজারের বেশি ছাত্র-ছাত্রী, অভিভাবক, নীতি নির্ধারক এবং কুড়ি লাখ অনলাইন ভিজিটর অংশ নেন। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন।

ইউনিসেফের মতে, অনলাইনে শিশুদের ব্যাপক উপস্থিতি থাকলেও তাদের সুরক্ষার জন্য খুব সামান্যই দৃষ্টি দেওয়া হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি এডোয়ার্ড বেইগবেদার তাঁর ভাষণে বলেন, ইন্টারনেট প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রবর্তন করা হলেও বর্তমানে শিশু–কিশোরেরা তা ব্যবহার করছে এবং এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে তাদের জীবন ও ভবিষ্যত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ডিজিটাল জগতে বৈশ্বিক শিশু পরিস্থিতি-২০১৭ প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রযুক্তি সম্পর্কে যথাযথ শিক্ষা না থাকার কারণে শিশুদের গোপনীয়তা রক্ষা করা যাচ্ছে না। তাদের ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার হচ্ছে। ক্ষতিকর কনটেন্টে শিশুরা প্রবেশ করছে। অনলাইন হুমকিরও শিকার হচ্ছে তারা।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মোবাইল ফোন ও প্রযুক্তির সহজলভ্যতার কারণে শিশুরা অনলাইনে কী দেখছে, তা তদারক করা যাচ্ছে না।

ফেসবুকের ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার কর্মসূচি প্রধান রিটেশ মেহতা অনুষ্ঠানে বলেন, “শিশুরা এখন অনলাইনে অনেক বেশি সময় ব্যয় করছে। তাই, অনলাইনে কীভাবে নিজেদের নিরাপদ রাখতে পারে, সে ব্যাপারে তাদের শেখাতে হবে। বর্তমানে পিতা-মাতা ও শিক্ষকদের উচিত শিশুরা কীভাবে অনলাইনে নিরাপদ থাকতে পারে সে ব্যাপারে আলোচনা করা।”

তিনি আরো বলেন, “পিতা-মাতা তাঁদের সন্তানদের পাবলিক প্লেসে, খেলতে গিয়ে ও স্কুলে যেভাবে নিরাপদ থাকার পরামর্শ দেন, ঠিক তেমনিভাবে বর্তমানে প্রযুক্তি থেকে কীভাবে তাঁদের সন্তান নিরাপদ থাকতে পারে সেব্যাপারে পরামর্শ দিতে পারেন। আমরা এই ধরনের আলোচনা উৎসাহিত করি।”

ইউনিসেফ ও ফেসবুকের যৌথ উদ্যোগে এই কর্মসূচির মাধ্যমে সকল শিশুকে কম খরচে অনলাইন উপাদান সরবরাহ করা হবে। তা ছাড়া, অনলাইনের অপব্যবহার, শোষণ, পাচার, ভয়-ভীতি প্রদর্শন ইত্যাদি ক্ষতিকর কনটেন্ট থেকে রক্ষা করা, অনলাইনে শিশুর গোপনীয়তা নিশ্চিত করা এই কর্মসূচির লক্ষ্য।

এই কর্মসূচির আওতায় অনলাইনে শিশু-কিশোরেরা কী কী ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে, সে ব্যাপারে পিতা-মাতা ও শিক্ষকদের কাছে ব্যাখ্যা করা হবে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশের আড়াই কোটি শিশুকে নিরাপদ ইন্টারনেট পাওয়ার ব্যাপারে সচেতন করা হবে বলে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে ইউনিসেফ।

মিরপুরের জুভিনাইল ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের এক শিক্ষার্থীর পিতা মোশাররফ হোসেন বেনারকে বলেন, “এই উদ্যোগ আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপুর্ণ। ইন্টারনেটে নিরাপদ থাকাটা এখন সবার দাবি। এখন অনেক স্কুল অনলাইনে ক্লাশ ওয়ার্ক দেয়। আমাদের অনেকের বাসায় ওয়াই-ফাই সুবিধা আছে। ছেলে-মেয়েরা খুব সহজেই অনলাইনে চলে যায়। আমাদের সবার পক্ষে সব সময় তারা কী দেখছে তা ফলো করা সম্ভব হয় না।”

ওই অভিভাবক বলেন, “আমরা মিডিয়া থেকে জানতে পেরেছি যে, অনেক মেধাবী ছেলেমেয়েরা জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়েছে অনলাইনের মাধ্যমে। পর্নোগ্রাফির ঝুঁকি তো আছেই। আমরা ইন্টারনেট থেকে সন্তানদের দূরে রাখতে পারব না। তাই, ইন্টারনেট ব্যবহার অবশ্যই নিরাপদ হতে হবে।”

তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আবু সাঈদ খান বেনারকে বলেন, ইউনিসেফ ও ফেসবুকের এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তবে, এই কৌশল কতটুকু কাজে দেবে, সে ব্যাপারে সন্দেহ আছে।

তিনি বলেন, “শিশুদের অনলাইনে লেখাপড়া ও শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য ইন্টারনেটের চেয়ে ইন্ট্রানেটে যাওয়া উচিত। ইন্টারনেট হলো আজিজ সুপার মার্কেট। আর ইন্ট্রানেট হলো একটি নির্দিষ্ট গ্রন্থাগার। শিক্ষার্থীদের ইন্ট্রানেটে রাখলে তারা নির্দিষ্ট কনটেন্টের বাইরে অন্য কনটেন্ট দেখতে পাবে না।”

আবু সাঈদ খান বলেন, তবে ইন্ট্রানেট প্রবর্তন করতে হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগারগুলোকে ডিজিটালাইজড করতে হবে।

“বাংলাদেশে শিশু কিশোরদের উপযোগী ইন্টারনেট পণ্য নিয়ে অনুষ্ঠিত প্রথম কনফারেন্স এটি,” ওই সম্মেলনে বলেছেন আয়মান সাদিক। সম্প্রতি তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত ব্যবসাভিত্তিক ম্যাগাজিন ফোবর্সের বিচারে এশিয়ার সেরা ৩০ তরুণ উদ্যোক্তার একজন নির্বাচিত হয়েছেন।

ব্যবহার কমানোর উপায় খোঁজা হচ্ছে

বাংলাদেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সামাজিক মাধ্যমে যুক্ত করতে ফেসবুক তাদের একটি সীমিত সংস্করণ বিনামূল্যে ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছে। বিটিআরসি চেয়ারম্যান শাহজাহান মাহমুদ বেনারকে বলেন, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী মোট জনসংখ্যার মাত্র অর্ধেক। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো অল্পবয়স্কদের মধ্যে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

বিটিআরসি চেয়ারম্যান জানান, সরকারের পক্ষ থেকে ফেসবুক বন্ধ করার কোনো প্রস্তাব তাঁদের কাছে নেই। তবে ব্যবহার কমাতে সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যাপসগুলোয় প্রবেশের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা আগেই করা হয়েছিল।

“এটিকে এখন নিয়ন্ত্রণ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা দেশের জন্য, বিশেষ করে তরুণদের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়,” বলেন শাহজাহান মাহমুদ।

তরুণদের স্মার্টফোনে ‘কন্টেন্ট ফিল্টারিং’ প্রবর্তনের কথাও ভাবা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

তবে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার কোনো ক্ষতি হচ্ছে না বলে মনে করেন তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার।

তিনি বেনারকে বলেন, “আমি নীতিগতভাবে বিশ্বাস করি, ছাত্রছাত্রীদের ইন্টারনেট বা সোশাল মিডিয়া থেকে দূরে সরিয়ে ডিজিটাল বিপ্লবে শরীক হওয়ার চিন্তা অবাস্তব। আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তাদের সচেতন করা, প্রবেশাধিকার কেড়ে নেওয়া নয়।”

“আমরা (সরকার) সোশাল মিডিয়াসহ তথ্য-প্রযুক্তির বিভিন্ন টুলস ব্যবহার করে শিক্ষাদানের বিস্তৃতি বাড়াতে চাইছি,” বলেন মোস্তফা জব্বার।

অনেক ক্ষেত্রে সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমেও শিক্ষার্থীরা জ্ঞান আহরণ করছে—এ কথা উল্লেখ মন্ত্রী বলেন, “আমি যত দূর বুঝি, শিক্ষার্থীদের জন্য ক্ষতিকর সাইটগুলো বন্ধ করা যেতে পারে।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন