Follow us

মানব পাচার সংক্রান্ত মার্কিন প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণ তালিকায় বাংলাদেশ

বেনার নিউজ স্টাফ
ওয়াশিংটন ডিসি
2017-06-27
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ইভানকা ট্রাম্পের হাত থেকে মানব পাচার রিপোর্ট হিরো পুরস্কার গ্রহণ করে নিজের আসনে ফিরছেন থাইল্যান্ডের বুম মোসবি (ডানে)। ২৭ জুন ২০১৭।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ইভানকা ট্রাম্পের হাত থেকে মানব পাচার রিপোর্ট হিরো পুরস্কার গ্রহণ করে নিজের আসনে ফিরছেন থাইল্যান্ডের বুম মোসবি (ডানে)। ২৭ জুন ২০১৭।
AFP

মানব পাচার সংক্রান্ত অপরাধের তদন্ত, বিচার ও শাস্তির ক্ষেত্রে গত বছর উদ্যোগের অবনতির ফলে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ২০১৭ সালের মানব পাচার সংক্রান্ত ‘ট্রাফিকিং ইন পারসনস’ (টিআইপি) প্রতিবেদনে এক ধাপ নেমে বাংলাদেশের অবস্থান চলে এলো পর্যবেক্ষণ তালিকায়।

প্রতিবেদনটি বাংলাদেশকে পর্যবেক্ষণ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার যুক্তি হিসেবে ২০১৫ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে যৌন ও শ্রম ক্ষেত্রে মানব পাচার বিষয়ে তদন্তের পরিমাণ কমে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে।

গত বছর সরকার ১২২টি যৌন ও ১৬৮টি শ্রম সংক্রান্ত মানব পাচারের ঘটনা তদন্ত করে। অন্যদিকে ২০১৫ সালে যৌন সংক্রান্ত ১৮১টি ও শ্রম সংক্রান্ত ২৬৫টি পাচারের ঘটনা তদন্ত করে সরকার।

গত বছর এই সব অপরাধে শাস্তির ঘটনা ছিল তিনটি, যা ২০১৫ সাল থেকে চারটি ও ২০১৪ সাল থেকে ১৫টি কম।

প্রতিবেদনটি জানায়, “পর্যবেক্ষকদের মতে, এসব ক্ষেত্রে শাস্তির ঘটনা খুবই বিরল। তদন্তের জন্য সরকার সুনির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত জনবল না দেওয়া ও তাড়াহুড়ো করে মামলা শেষ করার প্রবণতার কারণে প্রায় ক্ষেত্রেই যথেষ্ট প্রস্তুতির অভাবে বিচারকার্যগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ে।”

মানব পাচার প্রতিরোধের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের প্রচেষ্টার প্রশংসা করলেও, বিদেশগামী শ্রমিকদের ওপর ধার্য করা ফি বিষয়ে বাংলাদেশ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলে প্রতিবেদনটি মন্তব্য করে।

“সরকার বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজকে ক্রমাগতভাবে বিদেশগামী শ্রমিকদের ওপর উচ্চ হারে ফি ধার্য করার সুযোগ দিচ্ছে, যা শ্রমিকদের দারিদ্র ও পাচারের ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।”

এ প্রসঙ্গে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এর এশিয়া বিভাগের উপ-পরিচালক ফিল রবার্টসন এই পদাবনতি প্রাপ্য ছিল বলে মন্তব্য করেন।

“দালাল নিয়ন্ত্রণ, প্রবাসী শ্রমিকদের নির্যাতন থেকে রক্ষা করা, মানব পাচারকে কেন্দ্র করে দুর্নীতি, অথবা মিয়ানমারের সহিংসতায় পালিয়ে আসা দুই লক্ষ রোহিঙ্গাসহ ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা দেওয়া; সব ক্ষেত্রেই যে কোনো মানদণ্ডে বাংলাদেশ ব্যর্থ।”

তিনি বেনারকে বলেন, “এই পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ব্যক্তিগতভাবে সম্পৃক্ত হয়ে পুনরায় শুরু করতে হবে।”

“মানব পাচার প্রতিরোধের জন্য জনগণকে সম্পৃক্ত করে বাংলাদেশ সরকারকে এই অভিযানে নেতৃত্ব দিতে হবে,” বলেন রবার্টসন।

মালয়েশিয়ার উন্নতি

প্রতিবেদনটি মালয়েশিয়ার দ্বিতীয় স্তরে উন্নতির পেছনে মানব পাচার প্রতিরোধে দেশটির তদন্ত, বিচার ও শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান অগ্রতির বিষয়টি উল্লেখ করেছে। তবে মানব পাচারের শিকারদের সুরক্ষা দেবার ক্ষেত্রে দেশটির অবস্থা আগের মতোই অপর্যাপ্ত রয়েছে বলেও উল্লেখ করেছে প্রতিবেদনটি।

মালয়েশিয়া ২০১৬ সালে মানব পাচারের সম্ভাব্য ৫৮১ ঘটনার তদন্ত করেছ, যা আগের বছর ছিল ১৫৮টি। এছাড়া দেশটি ওই বছর ১৭৫জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করে, যা আগের বছর থেকে ৩৮টি বেশি। পাশাপাশি দেশটিতে ৩৫জনের বিরুদ্ধে বিচারে রায় হয়, যার মধ্যে ১৮টি শ্রম সংক্রান্ত ও ১৭টি যৌন সংক্রান্ত মানব পাচারের ঘটনা।

প্রতিবেদেন মানব পাচারের শিকার লোকজনকে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে দেশটির ক্রমবর্ধমান উদ্যোগের প্রশংসা করলেও, মন্তব্য করা হয় যে, পাচারের শিকার লোকজনকে সুরক্ষা দেবার ক্ষেত্রে দেশটি এখনো পিছিয়ে রয়েছে।

“সরকার সব ক্ষেত্রে ঝুঁকির মধ্যে থাকা প্রবাসী শ্রমিকদের বিষটি মানব পাচারের মানদণ্ডে নজরদারি করেনি, যা অজানাসংখ্যক সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের সুরক্ষার আওতার বাইরে রেখেছে,” মন্তব্য করে প্রতিবেদনটি।

“মানব পাচারের শিকার সব ভুক্তভোগীকে চলাফেরার স্বাধীনতা দেওয়া হয়নি, এছাড়া তদন্ত চলাকালীন কাজেরও অনুমতি মিলেনি তাঁদের,” জানায় প্রতিবেদনটি।

তবে রবার্টসনের মতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর মানব পাচার প্রতিরোধের ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার ভূমিকাকে ধামাচাপা দিয়েছে।

“বাস্তবতা হলো, মানব পাচারের সঠিক সংখ্যার বিপরীতে খুব অল্পসংখ্যক ভুক্তভোগীকেই মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ চিহ্নিত করতে পেরেছে। দেশটিতে দক্ষিণপূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে আসা শ্রমিকরা শ্রমক্ষেত্রে কঠোর ভাবে নিয়ন্ত্রিত ও বাধ্য। ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা দেবার ক্ষেত্রে সরকারের উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা খুবই অপ্রতুল, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা আমলাতান্ত্রিক জটিলতার লাল ফিতায় আবদ্ধ,” বলেন ফিল রবার্টসন।

পাচারের শিকার দুই কোটি মানুষ

যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভিক্টিমস অব ট্র্যাফিকিং অ্যান্ড ভায়োলেন্স প্রোটেকশন অ্যাক্ট’ অনুযায়ী দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর মানব পাচার বিষয়ে সচেতনা বৃদ্ধির জন্য প্রতি বছর টিআইপি প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে। প্রতিবেদনটি মানব পাচার বিষয় মোকাবেলায় বিভিন্ন দেশের উদ্যোগ ও সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর ১৮৮টি দেশকে র‍্যাংকিং করে থাকে।

এতে গত বছর বাংলাদেশের অবস্থান ছিল দ্বিতীয় স্তর বা টায়ার-২ তে, সেখান থেকে একধাপ নেমে এবার বাংলাদেশের অবস্থান টায়ার-২ এর পর্যবেক্ষণ তালিকায়।

অন্যদিকে গত বছরের পর্যবেক্ষণ তালিকায় থাকা মালয়েশিয়া এবার এক ধাপ ওপরে উঠে দ্বিতীয় স্তরে অবস্থান নিয়েছে। ভারত ও ইন্দোনেয়াশিয়া আগের বছরের মতোই রয়েছে দ্বিতীয় স্তরে। এই বছরও অপরিবর্তিত রয়েছে থাইল্যান্ডের পর্যবেক্ষণ স্তর ও ফিলিপাইনের প্রথম স্তরে অবস্থান।

তবে এবার কোনো দেশকেই তৃতীয় স্তর বা সর্বনিম্ন স্তরে তলিকাভুক্ত করা হয়নি।

মানব পাচারের শিকারদের রক্ষা করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় মানদণ্ড মেনে চলা দেশগুলোকে টায়ার ১ বা প্রথম স্তরে ধরা হয়ে থাকে। যে সব দেশ এসব ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় মানদণ্ড অর্জনে উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ গ্রহণ করে তারা দ্বিতীয় স্তর।

যেসব দেশ মানদণ্ড অজর্নের চেষ্টা করছে কিন্তু কার্যকর ক্ষেত্রে যথেষ্ট প্রমাণ দিতে ব্যর্থ, পাশপাপাশি উল্লেখযোগ্য হারে পাচারের শিকার মানুষ ও বিভিন্ন ধরনের মানব পাচারের অস্তিত্ব রয়েছে, সেসব দেশকে রাখা হয় দ্বিতীয় স্তরের পর্যবেক্ষণ তালিকায়।

বর্তমান বিশ্বে আনুমানিক দুই কোটি মানুষ পাচারের শিকার বলে প্রতিবেদন প্রকাশনা অনুষ্ঠানে জানান যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স ডব্লিউ টিলারসন।

“মানব পাচার এই সময়ে মানবাধিকারের সবচে দুঃখজনক ঘটনাগুলোর একটি। এটি পরিবারগুলোকে ভেঙে দেয়, বিশ্ব বাজারকে ধ্বংস করে, আইনের শাসনকে উপেক্ষা করে এবং অন্য সকল আর্ন্তদেশীয় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিস্তার ঘটায়,” প্রতিবেদনে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলেন টিলারসন।

“এটি জননিরাপত্তা ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি,” বলেন তিনি।

তিনি বলেন, “এক্ষেত্রে সবচে জঘন্য বিষয়টা হলো, এই অপরাধ মানুষের মর্যাদা ও স্বাধীনতা হরণ করে। এজন্য আমাদেরকে অবশ্যই মানব পাচার সংক্রান্ত অপরাধের অবসান ঘটাতেই হবে।”

অগ্রবর্তী যারা

প্রতিবেদনটি ঐতিহ্যমতো এবারও ‘২০১৭ টিআইপি রিপোর্ট হিরোস’ হিসেব আটজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নাম ঘোষণা করে। যার মধ্যে মানব পাচারের শিকারদের সহায়তা করার ক্ষেত্রে অবদানের জন্য একজন থাই ও ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন।

এতে থাইল্যান্ডের এইচইউজি প্রকল্পের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক বুম মোসবিকে “যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুদের সহায়তাকারী” হিসেবে সম্মানিত করা হয়।

২০১৫ সালে তিনি থাইল্যান্ডের চিয়াং মাই এ শিশুদের জন্য অ্যাডভোকেসি সেন্টার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে এই ধরনের প্রথম উদ্যোগ।

ভারতের তেলেঙ্গানা রাজ্যের রাচাকোন্দা পুলিশ কমিশনার মহেশ ভগবতকে গত ১৩ বছর ধরে মানব পাচারের বিরুদ্ধে অব্যাহত লড়াইর জন্য পুরস্কৃত করা হয়। এতে বলা হয় “তাঁর নেতৃত্বে এক বছরের কম সময়ে রাচাকোন্দা পুলিশ ২৫টি পতিতালয়, পাঁচটি হোটেল ও ২০টি আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট বন্ধ করেছে। পাশাপাশি তিনি দেশের বৃহত্তম শ্রমিক পাচার বিরোধী অভিযানগুলোর একটিতে অংশগ্রহণ করেছেন, যেখান থেকে সাড়ে তিনশোটি শিশুকে ইটভাটার শ্রম দাসত্ব থেকে উদ্ধার করা হয়।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন