নতুন নেতৃত্বে হেফাজতে ইসলাম, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা

শরীফ খিয়াম
ঢাকা
2020-11-19
Share
201119-BD-religion.hefazat-1000.jpeg ইসলামের মহানবীকে ব্যঙ্গ করে কার্টুন প্রকাশ ও এর পক্ষে অবস্থান নেয়ায় ঢাকায় ফ্রান্স বিরোধী সমাবেশে বক্তব্য দিচ্ছেন হেফাজতে ইসলামের নেতা জুনায়েদ আহমেদ বাবুনগরী। ২ নভেম্বর ২০২০।
[শরীফ খিয়াম/বেনারনিউজ]

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা এবং ইসলামের মহানবীকে ব্যাঙ্গ করে কার্টুন প্রকাশ সমর্থনের কারণে ফ্রান্সের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবিতে একাধিকবার বিক্ষোভ-সমাবেশ করা হেফাজতে ইসলামী বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

কট্টর ইসলামপন্থী অরাজনৈতিক এই সংগঠনটির সরকারবিরোধী অংশের নেতৃত্বে কমিটি গঠনের পর সরকার সমর্থক অংশটি পাল্টা কমিটি গঠনের ঘোষণা দিয়েছে।

সংগঠনের সাবেক মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরীর নেতৃত্বে গত ১৫ নভেম্বর হেফাজতের নতুন কমিটি গঠন হয়, যাঁরা সরকারবিরোধী বা বিএনপি-জামায়াত ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত।

নতুন নেতৃত্বের বিরোধিতা করে সরকারপন্থী বলে পরিচিত প্রয়াত আমির (সভাপতি) শাহ আহমদ শফীর ছেলে মাওলানা আনাস মাদানীর সমর্থকেরা পাল্টা কমিটি করার ঘোষণা দিয়েছেন।

সম্মেলনের দিনই ঢাকায় শফীপন্থীদের বৈঠক শেষে সদ্য বিলুপ্ত কমিটির নায়েবে আমির মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস নতুন কমিটি প্রত্যাখানের ঘোষণা দেন।

হেফাজতের সদ্য বিলুপ্ত ঢাকা মহানগর কমিটির দপ্তর সম্পাদক মাওলানা আলতাফ হোসাইন বেনারকে বলেন, “আগামী ৩১ ডিসেম্বরের আগেই নতুন কমিটি গঠন করা হবে।”

“আমাদের মনে হচ্ছে, সরকার বা অন্য কোনো গোষ্ঠীর সমর্থন নিয়ে তারা (শফীপন্থীরা) পাল্টা কমিটি করতে পারে,” বেনারকে জানান নতুন কমিটির নায়েবে আমির (সহসভাপতি) ড. আহমাদ আবদুল কাদের।

হেফাজতের বিলুপ্ত কমিটির যুগ্ম-মহাসচিব মাওলানা মঈনুদ্দীন রুহীর মতে, এখন বিএনপি-জামাত জোটের ‘এজেন্ডা’ বাস্তবায়ন করতে চাইছেন বাবুনগরী এবং তাঁর অনুসারীরা।

“বর্তমান কমিটি রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য সংগঠনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে চায়। আমরা হেফাজতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখব,” বৃহস্পতিবার বেনারকে বলেন তিনি।

রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধিত না হলেও হেফাজত কখনোই অরাজনৈতিক সংগঠন ছিল না বলে মন্তব্য করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. কে এম মহিউদ্দিন।

তিনি বেনারকে বলেন, “ক্ষমতাসীন এবং বিরোধী দল; দুই পক্ষেরই হেফাজতের মধ্যে নিজেদের লোক তৈরি করার এবং তাঁদের নেতৃত্বে রাখার চেষ্টা আছে।”

“সেখানে বিএনপি-জামায়াতের লবিটা এখন শক্তিশালী হয়েছে। এতদিন এই অংশটি কোনঠাসা ছিল। কারণ সরকার প্রয়াত আহমদ শফী এবং তাঁর পুত্রদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেছিল,” বলেন ড. মহিউদ্দিন।

 

 

বঙ্গবন্ধু ভাস্কর্যের বিরোধিতা

সম্প্রতি ঢাকার ধোলাইপাড় এলাকায় শেখ মুজিবুর রহমানের একটি ভাস্কর্য নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এর প্রতিবাদে হেফাজতে ইসলামসহ ইসলামপন্থী দলগুলো আবারো ভাস্কর্য বিরোধী আন্দোলন শুরু করে।

গত ২ নভেম্বর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ চত্ত্বরে ফ্রান্স দূতাবাস ঘেরাও পূর্ব সমাবেশে একাধিক বক্তা বলেন, ভাস্কর্য বা স্বাধীনতা স্তম্ভের নামে কারো ছবি প্রদর্শন ও মূর্তি বানানো মেনে নেওয়া হবে না।

পরে শান্তিনগর মোড়ে কর্মসূচির সমাপ্তি ঘোষণাকালে বাবুনগরী বলেন, “হেফাজত ইসলামের আন্দোলন মূর্তি ভাঙার আন্দোলন।”

এদিকে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ চত্ত্বরে বৃহস্পতিবার এক সমাবেশে “হেফাজত সরকারের বা বিরোধী দলের সংগঠন নয়,” বলে দাবি করেন নতুন কমিটির যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক।

“বঙ্গবন্ধুর প্রতি জাতীয় নেতা হিসেবে আমাদের পরিপূর্ণ শ্রদ্ধা রয়েছে,” উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে নয়, মূর্তি এবং ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে বলছি আমরা।”

এদিকে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙার দাবিকে ‘সংবিধান বিরোধী’ বলে মন্তব্য করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ।

তিনি বেনারকে বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া নেতা ও দেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল বা ভাস্কর্য শুধু শৈল্পিক কারণে নয়, ঐতিহাসিকভাবেও আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।”

হেফাজতের নেতাদের এসব দাবির বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবকে মন্ত্রী ফারুক খান এবং আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ বেনারের কাছে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

যে পথে এগিয়েছে হেফাজতের দ্বন্দ্ব

গত জুনে আনাসের সাথে দ্বন্দ্বের জেরে হেফাজতের দুর্গ হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের হাটহাজারীর দারুল উলুম মইনুল ইসলাম মাদ্রাসার সহকারী পরিচালকের পদ থেকে বাবুনগরীকে সরিয়ে দেওয়ার পর থেকে দুই পক্ষের বিরোধ স্পষ্ট হয়ে পড়ে।

এরই ধারাবাহিকতায় সেপ্টেম্বরে ছাত্র বিক্ষোভের মুখে মাদ্রাসার মুহতারিম (মহাপরিচালক) পদ থেকে পদত্যাগের ১২ ঘন্টার মাথায় মারা যান হেফাজতের প্রধান ১০৩ বছর বয়সী শাহ আহমদ শফী। ওই সময় হেফাজতের সাবেক প্রচার সম্পাদক আনাসকেও বরখাস্ত করা হয়।

শফীর অবর্তমানে হেফাজতের প্রধান নেতা হয়ে ওঠেন বাবুনগরী। তখন থেকেই তাঁর ও আনাসের মধ্যে প্রকাশ্যে নেতৃত্বের বিরোধ চলছে।

২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বর থেকে হেফাজতের অবস্থান উচ্ছেদকালে তৎকালীন মহাসচিব বাবুনগরীকে গ্রেপ্তার করা হলেও আমির শফীকে চট্টগ্রামে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তখন থেকেই হেফাজতের সরকার বিরোধী অংশের নেতা হিসেবে আলোচনায় আসেন বাবুনগরী।

সম্প্রতি হেফাজতের নেতৃত্ব বাবুনগরীর হাতে যাওয়ায় “সামগ্রিকভাবে সরকারবিরোধী শক্তি জোরদার হবে,” মনে করেন ড. মহিউদ্দিন।

ঢাকা থেকে প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন জেসমিন পাপড়ি।

মন্তব্য (0)

সব মন্তব্য দেখুন.

মন্তব্য করুন

নিচের ঘরে আপনার মন্তব্য লিখুন। মন্তব্য করার সাথে সাথে তা প্রকাশ হয় না। একজন মডারেটর অনুমোদন দেবার পর মন্তব্য প্রকাশিত হয়। বেনারনিউজের নীতিমালা অনুসারে প্রয়োজানে মন্তব্য সম্পাদনা হতে পারে। প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য বেনারনিউজ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয়বস্তুর সাথে প্রাসঙ্গিক থাকুন।