ভাস্কর্যের বদলে বঙ্গবন্ধুর নামে মিনার নির্মাণের প্রস্তাব আলেমদের

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2020-12-15
Share
ভাস্কর্যের বদলে বঙ্গবন্ধুর নামে মিনার নির্মাণের প্রস্তাব আলেমদের বাংলাদেশের ৪৯তম বিজয় দিবস উপলক্ষে গণভবন থেকে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এসময় ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। ১৫ ডিসেম্বর ২০২০।
[ফোকাস বাংলা]

ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য নির্মাণকে কেন্দ্র করে সরকারের সাথে চলমান টানাপোড়েন নিরসনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সাথে প্রথম দফা বৈঠক করেছেন দেশের দেশের শীর্ষ ১২জন আলেম। 

সোমবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবনে রাত নয়টা থেকে দুই ঘন্টার বেশি ধরে চলা এই বৈঠকে দুপক্ষ মতৈক্যে পোঁছাতে পারেনি বলে মঙ্গলবার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। 

বৈঠকে ভাস্কর্য নির্মাণের পরিবর্তে বঙ্গবন্ধুর নামে মিনার নির্মাণের প্রস্তাব করেন আলেমরা। উভয়পক্ষ আবার আলোচনায় বসবে বলে জানান আসাদুজ্জামান খান। 

এদিকে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে হেফাজতে ইসলামসহ ইসলামভিত্তিক কয়েকটি সংগঠনের নেতারা ভাস্কর্য ও মূর্তি ইস্যুতে নানারকম ব্যাখ্যা দিচ্ছেন।

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের আগে মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আলেমদের সাথে আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছে। যেহেতু আমরা আলোচনা শুরু করেছি, শিগগিরই এর একটি সমাধান পাবেন।” 

আলেমরা পাঁচটি প্রস্তাব দিয়েছেন, সেগুলো নিয়ে আলোচনা চলবে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমরা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করব না। আমরা সংবিধানের বাইরে কোনো কিছুই করব না।”

আলেমরা ভাস্কর্যের বিপরীতে “বঙ্গবন্ধুর নামে মিনার স্থাপনের প্রস্তাব করছেন” বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

এর প্রেক্ষিতে কী করা হবে তা নিয়ে আলোচনা চলছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, “এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।”

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে ঢাকায় বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের ঘোষণা করেছে সরকার। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে বলে বেনারকে জানান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ.ক.ম মোজাম্মেল হক। 

তবে ইসলামে ভাস্কর্য নির্মাণ ‘নিষিদ্ধ’ দাবি করে এবং ভাস্কর্যকে মূর্তি আখ্যা দিয়ে ১৩ নভেম্বর এক সমাবেশে নির্মাণ কাজ বন্ধের দাবি করেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিসের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা মামুনুল হক৷ তিনি হেফাজতে অন্যতম নেতাও বটে।

তাঁর কথার প্রতিধ্বনি করে হেফাজতের নতুন আমির জুনায়েদ বাবুনগরী বলেন, বঙ্গবন্ধু হোক আর জিয়াউর রহমানের হোক ভাস্কর্য নির্মাণ করা হলে তা অপসারণ করে ফেলা হবে। 

তাঁদের ভাস্কর্য-বিরোধী বক্তব্য দেয়ার পরদিনই গত ৪ ডিসেম্বর কুষ্টিয়া শহরে বঙ্গন্ধুর নিমাণাধীন ভাস্কর্য ভাংচুর করে সেখানকার দুই মাদ্রাসা ছাত্র। তাঁদের পালিয়ে যেতে সহয়তা করেন দুই শিক্ষক। পুলিশ ওই দুই ছাত্র ও দুই শিক্ষককে গ্রেপ্তার করেছে। 

এই ঘটনার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হয়। 

উদ্ভূত পরিস্থিতি সমাধানে গত ৫ ডিসেম্বর রাজধানীর যাত্রাবাড়ি মাদরাসায় বৈঠকে বসেন হেফাজতে ইসলামসহ দেশের শীর্ষ আলেমরা। 

বঙ্গবন্ধুর ‘মূর্তি’ নির্মাণ না করে কীভাবে সমস্যা সমাধান করা যায় সে ব্যাপারে কয়েকটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। ওই বৈঠকেই সরকারের সাথে আলোচনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন আলেমরা। তাঁরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে আলোচনা করতে চান। 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, “একটা সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। কেউ যেন ভাঙচুর বা আইনশৃঙ্খলা নষ্ট না করে, ওই বিষয়ে তাঁরা আমাদের সাথে একমত হয়েছেন।”

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যে তো পূজা করা হয় না। তাই এটি মুর্তি নয়। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণ করার উদ্দেশ্য হলো, যাতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁকে স্মরণ করতে পারে। 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পমাল্য প্রদান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন একটি অবিচ্ছেদ্য রাজনৈতিক কর্মসূচি। তবে ইসলামপন্থী দলের নেতারা এই সংস্কৃতিকে ইসলাম বিরোধী আখ্যায়িত করে থাকেন। 

বৈঠকে আলেমদের পক্ষে নেতৃত্ব দেন কওমি মাদরাসাগুলোর শিক্ষা বোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার (বেফাক) সভাপতি মাহমুদুল হাসান। ১২ জন আলেম ওই বৈঠকে অংশ যোগদান করেন। 

বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, আলেমরা এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য মিডিয়ায় দেবেন না। এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের সাথে কথা বলবেন।

আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শাজাহান খান বেনারকে বলেন, “হেফাজতসহ যারা ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করেন তাঁরা বঙ্গবন্ধুকে ভয় পান। কারণ তাঁরা জানেন জীবিত বঙ্গবন্ধুর চাইতে মৃত বঙ্গবন্ধু অনেক বেশি শক্তিশালী। সেকারণে তাঁরা চান না বঙ্গবন্ধুর কোনো স্মৃতিচিহ্ন অর্থাৎ কোনো ভাস্কর্য থাকুক। আর এই চাওয়া থেকেই তাঁদের ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতা।”

বিভিন্ন মুসলিম দেশে ভাস্কর্য থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “প্রকৃতপক্ষে হেফাজতীদের উদ্দেশ্য ইসলাম রক্ষা নয়। ইসলামের কথা বলে রাজনৈতিক দূরভিসন্ধি হাসিল করা।” 

শাজাহান খান বলেন, “আমার মনে হয় কিছু সংখ্যক আলেমের কথায় বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণ বন্ধ করা সঠিক সিদ্ধান্ত হবে না। বাংলাদেশ একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। এখানে সকল ধর্মের সমান অধিকার রয়েছে। ধর্ম নিয়ে যাতে কেউ আমাদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি না করতে পারে সেব্যাপারে সরকারকে সচেতন হতে হবে।” 

‘ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার করবেন না’

বাংলাদেশের ৪৯তম বিজয় দিবস উপলক্ষে মঙ্গলবার জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া এক ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার করবেন না। প্রত্যেকে নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার রাখেন। বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান–সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষের রক্তের বিনিময়ে এ দেশ স্বাধীন হয়েছে।”

তিনি বলেন, “এ দেশে ধর্মের নামে আমরা কোনো ধরনের বিভেদ-বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে দেবো না। ধর্মীয় মূল্যবোধ সমুন্নত রেখে এ দেশের মানুষ প্রগতি, অগ্রগতি এবং উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাবেন।” 

একাত্তরের পরাজতি শক্তির একটি অংশ মনগড়া বক্তব্য দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চাইছে বলে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ, ধর্মান্ধ নয়। ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার করবেন না।”

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন