Follow us

মানবপাচার রোধে একধাপ উন্নতি দেশের জন্য ‘সুখবর’: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

প্রাপ্তি রহমান
ঢাকা
2020-06-26
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
কুতুপালং শরণার্থী শিবিরের একটি বাজারে রোহিঙ্গাদের ভিড়। বাংলাদেশ থেকে মানব পাচারের শিকার হওয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে রোহিঙ্গারা অন্যতম। ১৫ মে ২০২০। [এএফপি]
কুতুপালং শরণার্থী শিবিরের একটি বাজারে রোহিঙ্গাদের ভিড়। বাংলাদেশ থেকে মানব পাচারের শিকার হওয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে রোহিঙ্গারা অন্যতম। ১৫ মে ২০২০। [এএফপি]
Photo: RFA

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিবেদনে মানবপাচার রোধে এক ধাপ অগ্রগতি হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন শুক্রবার এক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, “এটি একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন।”

বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপদেষ্টা ও তাঁর মেয়ে ইভাঙ্কা ট্রাম্প প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেন। ‘ট্র্যাফিকিং ইন পারসনস (টিআইপি)’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে মানবপাচার রোধে বাংলাদেশের উন্নতির বিষয়টি তুলে ধরা হয়।

এর প্রতিক্রিয়ায় শুক্রবার এক ভিডিও বার্তায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আপনাদের একটি সুখবর দিতে চাই। ...প্রতি বছর আমেরিকানরা একটা রিপোর্ট বের করে। গত বছরে আমাদের তারা টায়ার-২ ওয়াচ লিস্টে রেখেছিল। তা থেকে নেমে গেলে আমাদের বড় অমঙ্গল। বাংলাদেশ এখন এই ওয়াচ লিস্ট থেকে টায়ার-২ এ উন্নীত হয়েছে।”

ভিডিও বার্তায় মন্ত্রী উল্লেখ করেন, টায়ার-৩ এ নেমে গেলে বাংলাদেশ মার্কিনিদের সহযোগিতা পেত না, শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিনিময়ের যে কর্মসূচি রয়েছে সেগুলো থেকে বাদ পড়ে যেত, বিশ্বব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ত।

প্রায় পাঁচশ পাতার ওই প্রতিবেদনে ১৮০টি দেশের মানবপাচার পরিস্থিতির মূল্যায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৯ এর তুলনায় ভালো অবস্থানে থাকা দেশের সংখ্যা বাংলাদেশসহ ২২।

মানবপাচার তালিকায় একেবারে নিচের ধাপে আছে মিয়ানমার, চীন, উত্তর কোরিয়া, রাশিয়া, ইরান ও সিরিয়া।

প্রতিবেদনে অবশ্য বাংলাদেশের সাংসদ ও সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে জনশক্তি রপ্তানিকারকদের আঁতাত থাকার কথা উল্লেখ আছে।

প্রতিবেদনটি এমন সময়ে প্রকাশিত হলো যখন, বাংলাদেশের সাংসদ শহিদ ইসলাম পাপুল মানবপাচারের অভিযোগে কুয়েতের কারাগারে আছেন, সেখানে তাঁর ব্যাংক হিসাব জব্দ করার খবর কুয়েতের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে।

তা ছাড়া বুধবার মেসিডোনিয়া থেকে গ্রিস হয়ে ইতালি যাওয়ার সময় অর্ধশতাধিক বাংলাদেশিকে আটক করার খবর দিয়েছে একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম।

বৃহস্পতিবার প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও সরকার সমর্থিত পাচারের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের কথা তুলে ধরেন।

“আমরা সরকার সমর্থিত মানবপাচারের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। যে দেশ মানবপাচার নিয়ে এমন কোনো নীতি নিয়েছে যা তার নিজ দেশের মানুষকে নির্যাতনের মুখে ঠেলে দেয়, সে দেশের পক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দাঁড়াবে না,” প্রতিবেদনে পম্পেওকে উদ্ধৃত করে বলা হয়।

একধাপ ওপরে যে কারণে

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে আগের তুলনায় ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা এবং পাচারকারীদের বিচারের আওতায় আনার হার কিছুটা বেড়েছে।

“পাচারের শিকার ব্যক্তিদের শনাক্ত ও মানব পাচারকারীদের বিচারের আওতায় আনার হার বেড়েছে। বাংলাদেশের পাচারবিরোধী আইন বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সাতটি ট্রাইবুন্যাল গঠিত হয়েছে,” বলা হয় প্রতিবেদনে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেন বলেন, সরকার পাচারের দায়ে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের সনদ বাতিল করেছে, বিচারের আওতায় আনা হয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষকে।

এছাড়া গত বছর ৪০৩ টি মামলা হয়েছে, বিচার শুরু হয়েছে ৩১২টির। ২৫ জনের সাজা হয়েছে এবং অন্যায় কাজে জড়িত থাকায় ১৬২টি রিক্রুটমেন্ট এজেন্সির লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

পাচারের শিকার ব্যক্তিদের জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করেছে, বেসরকারি সংস্থাও এ কাজে যুক্ত হয়েছে জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, “তবে এখানেই শেষ নয়, আরও অগ্রগতি প্রয়োজন।”

উদ্বেগ যেসব ক্ষেত্রে

পাঁচশ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশ কোন কোন জায়গায় পিছিয়ে আছে সে সম্পর্কে মন্তব্য করা হয়েছে। এতে বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পাচারের মামলাগুলো আগের তুলনায় কম তদন্ত করছে। ধারাবাহিকভাবে পাচারের সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের যোগসাজসের অভিযোগ অস্বীকার করা হচ্ছে।

“রোহিঙ্গা নারীদের সেক্স-ট্রাফিকিং ও জোর করে কাজে বাধ্য করার মতো ভুরি ভুরি বিশ্বাসযোগ্য প্রতিবেদন আছে। সরকার কখনই এই প্রতিবেদনগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেয়নি,” বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এতে জানানো হয়, যেখানে যৌনতার জন্য শিশুদের পাচার করা হচ্ছে, সেখানে পাচারের শিকার শিশুদের শনাক্ত করার উদ্যোগ নেই।

“অনেক কর্মকর্তা মানব পাচার সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখেন না এবং শুধুমাত্র অভিবাসী শ্রমিকদের পাচারকে মানবপাচার বলে মনে করেন। কিছু কর্মকর্তা দেশের ভেতর পাচারের ঘটনা স্বীকারই করতে চান না, বিশেষ করে যৌনতার জন্য শিশু পাচারের বিষয়টি। যদিও পর্যবেক্ষকরা অনুমোদিত যৌনপল্লিতে নিয়মিত পাচার হয়ে যাওয়া শিশুদের বহু খবর প্রতি মাসে পাচ্ছেন,” প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এতে আরও বলা হয়েছে, সরকারি কর্তৃপক্ষ ও সাংসদদের সঙ্গে জনশক্তি রপ্তানিকারকদের আঁতাতের কারণে জনবান্ধব নীতি নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয়।

“সরকারি কর্মকর্তা, এমনকি সাংসদেরাও অভিবাসন ব্যবসায়ী বা জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলেন। তাই অভিবাসিবান্ধব কার্যক্রম গ্রহণের ক্ষেত্রে একটা স্বার্থের দ্বন্দ্ব দেখা যায়,”  বলা হয় এতে।

বাংলাদেশি একজন সাংসদ বিশ হাজারেরও বেশি শ্রমিককে ঘুষ দিয়ে কুয়েতে ঢোকানোর চেষ্টা করেন উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়,  প্রতিশ্রুত কাজের বদলে তাঁদের অন্য কাজে এবং চুক্তির চেয়ে কম টাকায় নিয়োগের ব্যবস্থা করেন ওই সাংসদ।

সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে বলা হয়, ২০১৫ থেকে ১৮ সালের মধ্যে মালয়েশিয়া এবং বাংলাদেশের দশটি জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান দুই দেশের সরকারকে ঘুষ দিয়ে অভিবাসন খাতে একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করেছিল। এতে করে অভিবাসনপ্রত্যাশী শ্রমিকদের অতিরিক্ত টাকা খরচ করতে হয়েছে। সরকার নির্ধারিত খরচ যখন ৩৭ হাজার টাকা ছিল, তখন অভিবাসী শ্রমিকদের গুনতে হয়েছে চার লাখ টাকা।

সরকারের শক্ত অবস্থান

সাংসদ শহিদ ইসলাম পাপুল বা সরকারি কর্তৃপক্ষের যোগসাজসের ব্যাপারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী কোনো মন্তব্য করেননি। তিনি জনগণকে মানবপাচারকারীদের ব্যাপারে সতর্ক থাকা ও সরকারকে অবহিত করার আহ্বান জানান।

অন্যদিকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ বলছে তারা মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীল অবস্থান নিয়েছে।

সিআইডির সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন বিভাগের বিশেষ সুপার জান্নাত আরা বেনারকে বলেন, “দেশজুড়ে আমরা অভিযান পরিচালনা করেছি। লিবিয়ায় প্রবাসীদের মৃত্যুর পর শতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৩৯ জনকে, আরও অনেকে নজরদারিতে আছেন। কেউ ছাড় পাবে না।”

অগ্রগতি ধরে রাখাটা বড় চ্যালেঞ্জ

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, বাংলাদেশের এই অগ্রগতি ধরে রাখাটা চ্যালেঞ্জ হতে পারে। মহামারি পরিস্থিতি এ অবস্থাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। কারণ বৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে আসছে।

“করোনাভাইরাসের কারণে বৈধভাবে প্রবাসে যাওয়ার পথ এমনিই সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এই সুযোগ পাচারকারীরা নিতে পারে। অনেককেই নানাভাবে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করবে তারা,” বেনারকে বলেন আসিফ মুনীর।

আইনের প্রয়োগ অব্যাহত না রাখলে এই অবস্থান ধরে রাখা যাবে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন জেসমিন পাপড়ি।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন