Follow us

মানব পাচারের অভিযোগে কলেজ শিক্ষক গ্রেপ্তার

প্রাপ্তি রহমান
ঢাকা
2018-08-20
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
মানব পাচার চক্রের হাতে পড়ে নিখোঁজ নিজের ১৪ বছরের ছেলের ছবি দেখাচ্ছেন উখিয়ার মোহাম্মদ ইলিয়াস। ২১ মে ২০১৫।
মানব পাচার চক্রের হাতে পড়ে নিখোঁজ নিজের ১৪ বছরের ছেলের ছবি দেখাচ্ছেন উখিয়ার মোহাম্মদ ইলিয়াস। ২১ মে ২০১৫।
এপি

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্রের এক নেতাকে গ্রেপ্তারের দাবি করেছে। নেতার নাম মো. আছেম। রাজধানী ঢাকায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে শিক্ষকতার আড়ালে সারা দেশে তিনি মানব পাচারের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন বলে জানাচ্ছে পুলিশের বিশেষায়িত সংস্থাটি।

সোমবার সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগের বিশেষ সুপার মোল্যা নজরুল ইসলাম বলেন, মোহাম্মদ আছেম শত শত ব্যক্তিকে সাগরপথে পাচার করেছেন। তিনি ও তাঁর পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রায় এক শ কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য পেয়েছে সিআইডি। টেকনাফে সুরম্য অট্টালিকা ছাড়াও ঢাকার কাছে নারায়ণগঞ্জে ছয়তলা বাড়ি রয়েছে মো. আছেমের।

রোববার ঢাকা থেকে আছেমকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি।

“মোহাম্মদ আছেম কাগজপত্র ছাড়া অবৈধপথে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় লোক পাঠাতেন। টেকনাফ থেকে মিয়ানমার হয়ে এই লোকগুলো থাইল্যান্ডে পৌঁছানোর পর পাচারের শিকার ব্যক্তিকে দিয়ে তিনি পরিবারের কাছে মুক্তিপণ চাইতেন। না দিলে খুন করে ফেলার হুমকি দিতেন,” মোল্যা নজরুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলনে বলেন।

মানব পাচারের অভিযোগে ঢাকায় গ্রেপ্তার মো. আছেম। ২০ আগস্ট ২০১৮। [প্রাপ্তি রহমান/বেনানিউজ]
মানব পাচারের অভিযোগে ঢাকায় গ্রেপ্তার মো. আছেম। ২০ আগস্ট ২০১৮। প্রাপ্তি রহমান/বেনানিউজ
সিআইডির কর্মকর্তা আরও বলেন, তদন্তে দেখা গেছে যারা মুক্তিপণ দেননি তাঁদের অনেকে এখন বিদেশের কারাগারে বন্দী আছেন। শুধু থাইল্যান্ডে অন্তত ২০ জন আটক থাকার কথা পুলিশ জানতে পেরেছে।

বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মানব পাচারের অন্যতম রুট হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে লম্বা সময় ধরে। বছর দু-এক আগে থাইল্যান্ডে অভিবাসী শ্রমিকদের গণকবর উদ্ধারের পর সাগরপথে মানব পাচার যে বাংলাদেশের জন্য বড় সংকট হয়ে উঠছে সে ব্যাপারে সকলে একমত হন। তবে এখনো মানব পাচার অব্যাহত রয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্তরক্ষী বাহিনীগুলোর সমন্বয়ক ফ্রন্টেক্স গেলো বছরের প্রথম ছয় মাসে ৮৯৯ বাংলাদেশির সাগরপথে অবৈধভাবে ইউরোপীয় দেশগুলোয় পৌঁছানোর খবর প্রকাশ করে এবং বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক মানব পাচারের অন্যতম উৎস বলে শনাক্ত করে।

তবে পুলিশ বলছে, তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। মানব পাচারের অন্যতম কেন্দ্র টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রণজিৎ কুমার বড়ুয়া বলছিলেন, তাঁরা এ ব্যাপারে সতর্ক আছেন।

“মানব পাচারের সম্ভাব্য রুটগুলোতে আমরা নজরদারি বাড়িয়েছি। আমরা নিয়মিত ওইসব জায়গায় টহল দিচ্ছি। আজও সোমবার) শাহপরীর দ্বীপ থেকে একজন গ্রেপ্তার হয়েছেন,” রণজিৎ কুমার বড়ুয়া বেনারনিউজকে বলেন।

মো আছেমের সম্পৃক্ততা যেভাবে

টেকনাফের স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মো আছেমের বাবা মো আনোয়ার হোসেন ও বড় ভাই মো খুবাইদ দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়া প্রবাসী। টেকনাফের মৌলভীপাড়ায় তাঁদের বাড়ি রয়েছে, জায়গাজমি ও ব্যবসাও রয়েছে। আছেমের বাবা ও বড় ভাইয়ের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্রের সুসম্পর্ক রয়েছে। এই ধারাবাহিকতায় আছেমও বাবা ও বড়ভাইয়ের সঙ্গে মানব পাচারের কাজে যুক্ত হন।

আছেম অবৈধপথে কাগজপত্র ছাড়া লোকজনকে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া পাঠান। সেখান থেকে আছেমের বাবা-ভাই ও তাঁদের অনুগত লোকজন ভুক্তভোগী শ্রমিকের বাড়িতে ফোন করেন। তাঁরা টাকা না পেলে হত্যা বা কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়ার ভয় দেখান।

২০১৬ সালে আবদুস সালাম নামে এক ব্যক্তি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া থানায় মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, তাঁর ছেলে মো. মাসুদকে অবৈধভাবে সাগরপথে মালয়েশিয়া নিয়ে গিয়ে কে বা কারা তাঁর কাছ থেকে তিন লাখ ১০ হাজার টাকা দাবি করেছে। পরে তিনি ঢাকার মহাখালিতে ইসলামী ব্যাংকের একটি শাখায় ওই টাকা পরিশোধ করেন।

মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি। ওই চেকের সূত্র ধরে সিআইডি মোহাম্মদ আছেমের সন্ধান পায়। জানা যায়, প্রথম প্রথম মুক্তিপণের টাকার অঙ্ক কম হওয়ায় প্রতিনিধি ও মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে আদায় করা হতো। পরে টাকার অংক বড় হয়ে যাওয়ায় ব্যাংক চেকের মাধ্যমে টাকা নিতে শুরু করেন মো আছেম।

সিআইডি জানিয়েছে মো আছেম, তার ছোট ভাই জাভেদ মোস্তফা, মা খতিজা বেগম ও অন্যান্য সহযোগীদের ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও টেকনাফের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ওইসব টাকার সন্ধান পাওয়া গেছে।

গতকাল সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন আরেক ভুক্তভোগী মো. সাইফুল ইসলাম। তিনি বলছিলেন, তাঁর ভাই মালয়েশিয়ায় এখন ফেরার।

“আমার ভাই বছর দু-এক আগে কাউকে কিছু না বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। পরে আমি মালয়েশিয়া থেকে একটা ফোন পেলাম। শুনি আমার ভাই কাঁদছে আর বলছে দুই লাখ ২০ হাজার টাকা ব্যাংকে জমা দিতে। নইলে ওকে মেরে ফেলবে,” সাইফুল ইসলাম বেনারনিউজকে বলেন।

তাঁর ছোট ভাই মো. সাদ্দাম একটি জুতার কারখানায় কাজ করতেন। তিনি ব্যাংকে টাকা জমা দিলেও তাঁর ভাই এখনো দেশে ফিরতে পারেননি। অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় রয়ে গেছেন। পুলিশি ঝামেলা এড়াতে একবার এক কারখানায়, আরেকবার আরেক কারখানায় কাজ করেন। অবৈধ বলে সব সময় মজুরিও পান না। মজুরি চাইলে কারখানা মালিক পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার ভয় দেখায়। সাইফুল পাচারকারী চক্রের লোকজনের দৃষ্টান্তমূলক সাজা চান।

শিক্ষকতা করতেন মো. আছেম

মো আছেম রাজধানীর তেজগাঁও বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে ব্যবসায় ব্যবস্থাপনার প্রভাষক বলে জানিয়েছে পুলিশ। ওই কলেজের অধ্যক্ষ মো. আবদুর রশিদ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তবে, তিনি আশ্রয়-প্রশ্রয় দেননি বলে দাবি করেন।

“আছেম ২০১৪ সাল থেকে কলেজে পড়ায়। তার আচার-আচরণে কোনো অস্বাভাবিকতা দেখিনি। চাকরিতে নেওয়ার আগে পুলিশ ভেরিফিকেশন হয়েছে। পাঁচ সদস্যের নিয়োগ বোর্ড সন্তুষ্ট হয়ে তাকে চাকরি দিয়েছে,” আবদুর রশিদ বেনারনিউজকে বলেন।

আবদুর রশিদ দাবি করেছেন তাঁর বিরুদ্ধে মানব পাচারের মামলা আছে সে সম্পর্কে তাঁরা কিছু জানতেন না।

সিআইডির তথ্যমতে, মো. আছেমের বিরুদ্ধে ২০১৫ সালে কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে, ২০১৬ সালে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া ও ২০১৭ সালে ঢাকার বনানীতে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন এবং মানি লন্ডারিং আইনে মামলা আছে।

আছেম গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাঁর পরিবারের সদস্যরা গা ঢাকা দেওয়ায় বেনারের পক্ষে তাঁদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন