যুদ্ধাপরাধী ও বঙ্গবন্ধুর খুনীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার আইনী প্রস্তুতি শুরু

ঢাকা থেকে জেসমিন পাপড়ি
2016.09.30
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
20160930-war-criminals1000.jpg ফাঁসি কার্যকর হওয়া চার যুদ্ধাপরাধীকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছিল। আগস্ট ২, ২০১০।
স্টার মেইল

বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারী ও দণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত হতে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে আইনের খসড়া তৈরির কাজ শুরু করেছে আইন মন্ত্রণালয়।

এ ছাড়া তাঁদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে গৃহীত হয়েছে।

এ পর্যন্ত ছয়জন যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আসামীর সংখ্যা প্রায় অর্ধশত।

এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় ১২ জনকে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়েছে, কার্যকর হয়েছে পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হলেও পলাতক আসামিদের ফিরিয়ে আনতে একটি টাস্কফোর্স গঠন করার কথা জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী।

যুদ্ধাপরাধী ও বঙ্গবন্ধুর খুনিদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার সিদ্ধান্তকে সময়োপযোগী ও ঐতিহাসিক বলে মনে করছেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ। তাঁরা বাজেয়াপ্ত করা সম্পত্তি হতদরিদ্র মুক্তিযোদ্ধা, বীরাঙ্গনা ও শহীদ পরিবারের সন্তানদের মধ্যে বণ্টন করার পরামর্শ দিয়েছেন।

যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ সাজার দাবিতে সরব বিভিন্ন সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে স্বাধীনতাবিরোধীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার দাবি জানিয়ে আসছিল। প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো না থাকায় এতদিন এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারীদের সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হোক’ শিরোনামের সিদ্ধান্ত প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন সরকারি দলের সংসদ সদস্য ফজিলাতুন্নেসা বাপ্পি।

আরও দশ জন সংসদ সদস্যের দেওয়া সংশোধনী প্রস্তাবে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত অপরাধীদের বিষয়টিও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরে সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়।

সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত: আইনমন্ত্রী

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এই সিদ্ধান্ত প্রস্তাবটিকে সময়োপযোগী বলে জানিয়েছেন। তবে পলাতক আসামিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত সহজ হলেও ফাঁসি কার্যকর হওয়া আসামিদের সম্পত্তি ওয়ারিশদের হাতে চলে যাওয়ায়, সেগুলো বাজেয়াপ্ত করা কঠিন হবে বলে জানান তিনি।

এ লক্ষ্যে আইন করা হচ্ছে বলে জানান আইনমন্ত্রী। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধুর হত্যা মামলার সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের ফিরিয়ে আনতে একটি টাস্কফোর্স গঠন করার কথাও জানান তিনি।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে আনিসুল হক বলেন, “৩১ মে  বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডে সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের ফিরিয়ে আনতে গঠিত টাস্কফোর্সের সভা অনুষ্ঠিত হয়। টাস্কফোর্সই পলাতক আসামিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে।”

তিনি বলেন, “প্রথমে বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার পরে দণ্ডপ্রাপ্ত খুনিদের যাদের ফাঁসি হয়েছে, আইনের মাধ্যমে তাদের সম্পত্তি  বাজেয়াপ্ত করা হবে।”

এই সম্পদ কল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার হোক

এ পর্যন্ত আপিল বিভাগে নিষ্পত্তির পর শীর্ষ ছয় যুদ্ধাপরাধী  জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লা ও মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী এবং জামায়াতের শূরা সদস‌্য মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে।

মামলা চলাকালীন  সময়েই আটক অবস্থায় মারা যাওয়ায় মুক্তিযুদ্ধকালীন জামায়াত আমির গোলাম আযম ও বিএনপির সাবেক মন্ত্রী আবদুল আলীমের আপিলের নিষ্পত্তি হয়ে গেছে।

তবে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে ট্রাইব্যুনালে দেওয়া সর্বোচ্চ সাজার রায় কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয় আপিল বিভাগ। এ রায়ের রিভিউ চেয়ে দুপক্ষই আপিল বিভাগে আবেদন করেছে। বিষয়টি এখনো বিচারাধীন।

এ প্রসঙ্গে ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ বেনারকে বলেন, “যুদ্ধাপরাধীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার যে সিদ্ধান্ত সরকার নিয়েছে তা অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং এটা আমাদের অনেক দিনের দাবি। আরও আগেই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল।”

তিনি বলেন, “তারা এ দেশের স্বাধীনতায়, সার্বভৌমত্বে বিশ্বাসী না। অথচ এ দেশের জনগণকে শোষণ করে সম্পদের পাহাড় করেছে। সে সম্পদ উপভোগ করেছে। তাই এ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে কল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার করতে হবে।”

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এই প্রসিকিউটরের মতে, “এ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে সাক্ষ্য দেওয়া হতদরিদ্র মুক্তিযোদ্ধাদের দেওয়া যেতে পারে।”

যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ বিচারের প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠে গণজাগরণ মঞ্চ। ওই মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার বেনারকে বলেন, “সম্পদ বাজেয়াপ্ত হতে যাচ্ছে এমন খবর প্রকাশের পর থকে যুদ্ধাপরাধীদের ওয়ারিশরা বিদেশে অর্থপাচার শুরু করেছে। তাই এ আইন কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত যুদ্ধাপরাধীদের সম্পদ জব্দ করা প্রয়োজন।”

বঙ্গবন্ধু হত্যার আসামীদেরও সম্পদ বাজেয়াপ্ত হবে

বাংলাদেশের স্বাধীন হওয়ার চার বছরের মধ‌্যে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট একদল বিপথগামী সেনা সদস্যের হাতে সপরিবারে প্রাণ দেন বাংলাদেশের স্থপতি ও প্রথম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান। দীর্ঘদিন পরে ১৯৯৬ সালে তাঁর কন্যা শেখ হাসিনার হাত ধরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে সে হত্যা মামলার বিচার শুরু করে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় আসলে  আপিল বিভাগে এ মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়।

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার ১২জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তের মধ্যে ২০১০ সালে সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ, বজলুল হুদা, মহিউদ্দিন আহমেদ, একেএম মহিউদ্দিনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

বাকিদের মধ‌্যে পলাতক আজিজ পাশা ২০০১ সালে জিম্বাবুয়েতে মারা যান। এখনও পলাতক রয়েছেন নূর চৌধুরী, আব্দুর রশিদ, শরিফুল হক ডালিম, এম রাশেদ চৌধুরী, আব্দুল মাজেদ ও রিসালদার মোসলেম উদ্দিন।

এই ১২ জনের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হবে। আইনমন্ত্রীর মতে, “বঙ্গবন্ধুকে যারা খুন করেছে তাদের বাংলাদেশে সম্পত্তি রাখার কোনো অধিকার নেই। এ জন্য তাদের সকল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে।”

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।