Follow us

পশ্চিমবঙ্গে ‘রিভেঞ্জ পর্নো’ মামলায় প্রথম শাস্তি ঘোষণা

পরিতোষ পাল
কলকাতা
2018-03-08
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
সোশ্যাল সাইটে আসক্তির কারণে তরুণদের ব্যক্তিগত সুরক্ষার বিষয় মাথায় থাকছে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ৮ মার্চ ২০১৮।
সোশ্যাল সাইটে আসক্তির কারণে তরুণদের ব্যক্তিগত সুরক্ষার বিষয় মাথায় থাকছে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ৮ মার্চ ২০১৮।
বেনারনিউজ

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে দ্রুততার সঙ্গে রিভেঞ্জ পর্নো মামলায় অপরাধীর শাস্তি ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট মহল। আদালতের রায়কে স্বাগত জানিয়েছে নির্যাতিতা মেয়েটির পরিবারও।

সরকারি আইনজীবী বিভাস চট্টোপাধ্যায় বেনারকে বলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে এই প্রথম সাইবার ক্রাইম মামলায় রায় ঘোষণা হলো। সাইবার ক্রাইম মামলার এই রায় দৃষ্টান্তমূলক।’’

বান্ধবীর নগ্ন ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়ার দায়ে ২৩ বছরের ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের এক ছাত্রকে বুধবার আদালত ৫ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে। সেইসঙ্গে ৯ হাজার রুপি জরিমানারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পূর্ব মেদিনীপুর জেলা আদালতের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (তৃতীয়) গৌতমকুমার নাগ অনিমেষ বক্সী নামের ওই ছাত্রকে দোষী সাব্যস্ত করে এই সাজা দেন।

অভিযুক্ত অবশ্য আদালতে নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করেছে।

অভিযুক্তের আইনজীবী সমীর কুমার ঘোড়াই বেনারকে বলেন, “সাজা ঘোষণার পরে জামিনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারক শর্তসাপেক্ষে অভিযুক্তকে জামিন দিয়েছেন। আমরা এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আবেদন করব।”

আদালতে সরকারি আইনজীবী এই ঘটনাকে ‘ভার্চ্যুয়াল রেপ’ বলে দাবি করেন। সেই সঙ্গে তিনি বলেন, এটি একটি রিভেঞ্জ পর্নোর গুরুতর অপরাধ।

বিভাস চট্টোপাধ্যায় বলেন, “এ ক্ষেত্রে যা করা হয়েছে তার প্রভাব প্রকৃত ধর্ষণের থেকেও মারাত্মক। আর তাই সরকারের কাছ থেকে যে ক্ষতিপূরণ ধর্ষিতারা পেয়ে থাকেন এ ক্ষেত্রে মেয়েটি তা পাওয়ার অধিকারী। বিচারক এই যুক্তি মেনে নিয়ে সরকারকে নিয়মমাফিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।”

রিভেঞ্জ পর্নো গুরুতর অপরাধ

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, পূর্ব মেদিনীপুরের পাঁশ কুড়ার রাধাবল্লভ চক গ্রামের বাসিন্দা কলকাতার একটি বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্র অনিমেষ বক্সী (২৩) এলাকারই বাসিন্দা পাঁশ কুড়া কলেজের ২০ বছরের এক ছাত্রীর একাধিক নগ্ন ছবি পর্নো সাইটে ছড়িয়ে দেয়। ছাত্রীটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সুবাদে ছবিগুলি তোলা হয়েছিল বলে অভিযোগ।

সম্পর্কে প্রত্যাখ্যাত হয়েই প্রতিশোধ নিতে ছেলেটি পর্নো সাইটে মেয়েটির নগ্ন ছবি ছড়িয়ে দেয় বলে অভিযোগ। সোশ্যাল সাইটে ছবির সঙ্গে মেয়েটির ও তার বাবার নামও দেওয়া হয়েছিল।

নির্যাতিতা মেয়েটি এই ঘটনার জেরে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল। এমনকি আত্মহত্যার সিদ্ধান্তও নিয়েছিল বলে সিআইডির এক তদন্তকারী অফিসার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন। তবে সকলের পরামর্শে ছাত্রীটি বাবাকে সঙ্গে করে ২০১৭ সালের ২১ জুলাই পাঁশ কুড়া থানায় অনিমেষের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে।

পুলিশ জানিয়েছে, তথ্য প্রযুক্তি আইনে মামলা দায়ের করা হয়। সিআইডি তদন্তে নেমে প্রথমেই অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে।

৪২ দিনের মাথায় চার্জশিট জমা দেওয়া হয় বলে জানান সরকারি আইনজীবী বিভাস চট্টোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “সাড়ে সাত মাসের মধ্যে চার্জশিট থেকে বিচার সম্পূর্ণ হয়েছে। দ্রুততার সঙ্গে বিচারের ক্ষেত্রে এটাও একটি নজির।”

আদালতে ১৮ জনের সাক্ষ্য এবং দুজন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের মতামত পেশ করা হয়েছিল। এ ছাড়া পেশ করা হয়েছিল ২০০টির বেশি ইলেকট্রনিক ও নন ইলেকট্রনিক প্রামাণ্য তথ্য।

অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি

অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক এই শাস্তির প্রয়োজন ছিল বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও মনোবিদরা।

কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী কেশব ভট্টাচার্য বেনারকে বলেন, “প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে কারও, বিশেষ করে মেয়েদের শালীনতা হরণ করা, অর্থাৎ রিভেঞ্জ পর্নোর মতো অপরাধের বিচারে এই মামলাটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।”

তিনি বলেন, “এই ধরনের অপরাধের প্রবণতা বেড়েই চলেছে। এর ফলে আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটছে। পশ্চিমবঙ্গে নিয়মিতই সাইবার অপরাধের অভিযোগে মামলা হচ্ছে।”

তবে পশ্চিমবঙ্গ সিআইডির সাইবার সেলে যোগাযোগ করেও এ ব্যাপারে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। আইনজীবীদের মতে, শুধু কলকাতাই নয়, জেলায় জেলায় সাইবার ক্রাইমের বহু মামলা ঝুলে রয়েছে।

সমাজবিজ্ঞানী মধুমিতা রায় বেনারকে বলেন, “সোশ্যাল সাইটে নারীর শালীনতা হানির ঘটনা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বহু ক্ষেত্রেই নৈতিকতাকে উপেক্ষা করে অশালীন ছবি পোস্ট করে ব্ল্যাক মেইল করা হচ্ছে। অনেক সময় মেয়েটিকে শিক্ষা দিতে প্রতিশোধ নেবার উদ্দেশ্যেও এসব করা হচ্ছে। এর প্রতিক্রিয়ায় আত্মহত্যার ঘটনা বেড়ে চলেছে।”

তিনি বলেন, “দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অবশ্যই প্রয়োজন রয়েছে, তবে প্রত্যেকেরই ব্যক্তিগত সুরক্ষার দিকে নজর রাখা দরকার।”

বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী ড. গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায় বেনারকে বলেন, এগুলো মনোবিকলনের অংশ হলেও আসলে বিবেক, বোধ যখন কাজ করে না তখন আইনের শাসন জরুরি হয়ে ওঠে। এ ক্ষেত্রে যেভাবে দ্রুততার সঙ্গে বিচার করে শাস্তি ঘোষণা করা হয়েছে, তা নিশ্চিতভাবেই একটি সদর্থক বার্তা দেবে।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন