পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন: মোদি ও মমতার দলের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস

যাজ্ঞসেনী চক্রবর্তী
কলকাতা
2021-03-26
Share
পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন: মোদি ও মমতার দলের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণার সময় জনতার উদ্দেশ্যে অভিবাদন জানাচ্ছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২৯ ডিসেম্বর ২০২০।
[এএফপি]

শনিবার থেকে শুরু হওয়া পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস এবং কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস দিচ্ছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা। 

বামফ্রন্ট-কংগ্রেসের সাথে নবগঠিত ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ) যুক্ত হয়ে তৈরি তৃতীয় জোটও সক্রিয় রয়েছে নির্বাচনী মাঠে। 

শনিবার থেকে শুরু হয়ে মোট আট দফায় এক মাসের বেশি সময় পর আগামী ২৯ এপ্রিল শেষ হবে পশ্চিমবঙ্গের ১৭তম বিধানসভার এই নির্বাচন। নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হবে ২ মে। 

বর্তমানে ভারতের একমাত্র নারী রাজ্যপ্রধান, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের এবারের মূল নির্বাচনী স্লোগান, ‘বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়’। 

রাজনীতি বিশ্লেষক ও কলকাতার ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিক্যাল ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক শুভময় মৈত্রের মতে, “মমতার কর্মজীবনের এই ধাপে বিজেপির কাছে পরাজিত হলে তাঁর দল অস্তিত্ব সংকটে পড়বে, কারণ একান্তই তাঁর ব্যক্তিগত আবেদনের উপর নির্ভরশীল তৃণমূল কংগ্রেস।” 

তবে বিজেপি এবার পশ্চিমবঙ্গে জিততে “মরিয়া” বলে জানান নয়াদিল্লির সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অফ ডেভেলপিং সোসাইটিজ-এর রাজনীতি বিশেষজ্ঞ আদিত্য নিগম। 

তাঁর মতে কোন কোন মুখ্যমন্ত্রী ভবিষ্যৎ রাজনীতির পথে বাধা তা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি “ভালোই বুঝতে পারছেন, সেই বিবেচনায় তাঁর দৃষ্টিতে প্রথম সারিতে আছেন মমতা।” 

আদিত্য নিগমের মতে, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর কেন্দ্রে যদি কোনো অ-বিজেপি জোট ক্ষমতায় আসত এবং তৃণমূল পশ্চিমবঙ্গে ৩০-৩৫টি লোকসভা আসন পেত “তবে মমতা অনায়াসে প্রধানমন্ত্রী পদের দাবিদার হতে পারতেন।” 

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে জিতে দ্বিতীয়বারের মতো যখন নরেন্দ্র মোদির বিজেপি ক্ষমতায় আসে তখন পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি আসনের মধ্যে তারা পেয়েছিল ১৮টি, তৃণমূল ২২টি। রাজ্যে বিজেপি পেয়েছিল ৪০ শতাংশ ও তৃণমূল পেয়েছিল ৪৩ শতাংশ ভোট। 

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, গত লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে এবার রাজ্যে নিজেদের নির্বাচনী ফলাফল সম্পর্কে দৃঢ় প্রত্যয়ী বিজেপি। যদিও সাম্প্রতিক হরিয়ানা, দিল্লি, মহারাষ্ট্র বা ঝাড়খণ্ড বিধানসভা নির্বাচনে তাদের ফলাফল খুব একটা আশাপ্রদ নয়। 

“তবে বিরোধী দলের বিধায়ক ভাঙিয়ে নিজেদের দলে নিয়ে আসার যে কৌশল বিজেপি আয়ত্ত করেছে, তার ফলে যথেষ্ট আসন না জিতলেও তাদের সরকার গড়ার সম্ভাবনা একেবারে নেই, এমন কথা বলা যায় না,” বলন নিগম। 

প্রসঙ্গত, এবারের নির্বাচনের আগে তৃণমূল কংগ্রেসের অনেক মন্ত্রী, বিধায়ক এবং স্থানীয় নেতা বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। 

যাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন মমতার এক কালের বিশ্বস্ত মুকুল রায়, শুভেন্দু অধিকারী এবং শোভন চট্টোপাধ্যায়ের মতো প্রথম সারির নেতা। 

পূর্ব মেদিনীপুর জেলার নন্দীগ্রাম কেন্দ্র থেকে মমতার বিপক্ষে বিজেপির প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করছেন শুভেন্দু। 

mamata2.jpg
কলকাতায় ভারতীয় জনতা পার্টির পক্ষে আয়োজিত নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য রাখছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ৭ মার্চ ২০২১। [এএফপি]

‘অনুদানের রাজনীতি’

এই নির্বাচনে বিজেপি সবচেয়ে সুবিধাজনক জায়গায় রয়েছে উল্লেখ করে শুভময় মৈত্র বলেন, “যতগুলো আসনই জিতুক, ওদের জন্য বোনাস।”

তাঁর মতে, “কমপক্ষে ৭০-৮০টি আসন ওরা পাবে বলে আমি মনে করি, যার ফলে এবার বেশ কিছু পরীক্ষামূলক সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিজেপি।” 

নির্বাচনী ইশতেহারে মেয়েদের বিনামূল্যে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত শিক্ষা, সরকারি চাকরিতে নারীদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ এবং বাংলায় প্রতিটি পরিবারের অন্তত একজন সদস্যের চাকরি, এরকম বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিজেপি। 

পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া অন্য কোনো বিধানসভা নির্বাচনে এর আগে এই ধরনের ঘোষণা করেনি বিজেপি।

বিজেপির এই কৌশলকে “অনুদানের রাজনীতি’ আখ্যা দিয়ে শুভময় মৈত্র বলেন, “আমার ধারণা, বিজেপি পরীক্ষা করছে, অনুদানের রাজনীতি ভোটে পরিণত করতে পারে কিনা।” 

ত্রিমুখী জোট 

বাম-কংগ্রেস বরাবরই একে অপরের শত্রু হিসেবে পরিচিত হলেও এবারের নির্বাচনে তারা এক জোট। এই জোটের তৃতীয় ফলা অর্থাৎ আইএসএফ-এর নেতৃত্বে রয়েছেন ফুরফুরা শরিফের বিতর্কিত পিরজাদা আব্বাস সিদ্দিকি। 

মধ্য-তিরিশের এই নেতার বেশ কিছু মন্তব্যের জেরে ইতিমধ্যেই তাঁর বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ উঠেছে। 

এই ত্রিমুখী জোট ১০ থেকে ১৫টি আসন পেলেও তা সরকার গঠনের সময় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করেন নোতর দাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির প্রাক্তন অধ্যাপক শৈবাল বসু। 

এই রাজনীতি বিশেষজ্ঞের মতে, “কোনো রাজনৈতিক জোটই একমুখী হয় না, এবং এখানে বাম ও কংগ্রেস, দুইয়েরই অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন আছে।”

বাংলায় তিন দশকের বেশি সময় ধরে শাসনে থাকা বামফ্রন্ট ২০১১ সালে হার স্বীকার করে তৃণমূলের কাছে এবং তার পর থেকেই ক্ষীণতর হয়েছে রাজ্যে বামেদের উপস্থিতি।

কংগ্রেসের অবস্থা আরো আগে থেকেই নাজুক। আইএসএফ খুবই নতুন দল হলেও কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের মতে তারা তৃণমূলের মুসলমান সমর্থকদের একাংশের ভোট কেটে নিতে পারে, যার সুবিধা পাবে বিজেপি। 

ভারতের ২০১১ জনগণনা অনুসারে পশ্চিমবাংলায় মুসলমান জনসংখ্যা প্রায় আড়াই কোটির মতো, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ। 

সিএএ-এনআরসি বৃত্তান্ত

কেন্দ্রের বিজেপি সরকার ২০১৯ সালে নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন (সিএএ) এবং এর আগের রাষ্ট্রীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) চালুর পর থেকেই দেশে তুমুল বিতর্ক চলছে।

সিএএ অনুযায়ী ভারতের প্রতিবেশী তিন দেশ; বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে আসা মুসলমান ছাড়া অন্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। 

বাংলাদেশের সাথে পশ্চিমবঙ্গের রয়েছে আড়াই হাজার মাইলের বেশি দীর্ঘ সীমান্ত। ভাষাগত ঐক্যের ফলে বাংলাদেশ থেকে আসা অভিবাসী এবং শরণার্থীরা বরাবরই পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় চেয়েছেন। ফলে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান নির্বাচনেও রয়েছে এর প্রভাব। 

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গোষ্ঠী হলো মতুয়া সম্প্রদায়, যাঁরা বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যার ১৭ থেকে ২০ শতাংশ। এঁদের অধিকাংশই ভারতে আসেন ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে। ফলে সিএএ-র দ্বারা উপকৃত হবার বিষয়ে আশাবাদী তাঁরা। 

ভোটের ফলাফলের ওপর তাঁদের সম্ভাব্য প্রভাবের কথা মাথায় রেখে তাঁদের খুশি রাখার চেষ্টা করছে তৃণমূল এবং বিজেপি দুইই। 

শুক্রবার থেকে বাংলাদেশ সফররত ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন শুরুর দিন শনিবার গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দিতে মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা হরিচাঁদ ঠাকুরের মন্দির পরিদর্শনের কথা রয়েছে। 

একাধিক পর্যালোচকের মতে, মতুয়াদের ভোট পাওয়ার আশাতেই মোদি হরিচাঁদ ঠাকুরের জন্মস্থান পরিদর্শনে যাচ্ছেন। 

পশ্চিমবাংলার মাতুয়াদের শিগ্গিরই নাগরিকত্ব দেয়া হবে বলে গত মাসে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা অমিত শাহ। 

সিএএ-র পাশাপাশি রয়েছে এনআরসি, যার উদ্দেশ্য হলো ভারতে বসবাসকারী নথিবিহীন অভিবাসীদের চিহ্নিত করা। বিজেপি এর আগে একাধিক বার জানিয়েছে যে, হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, জৈন এবং পার্সি সম্প্রদায়ভুক্তরা সিএএ দ্বারা সুরক্ষিত। উল্লেখযোগ্যভাবে তালিকা থেকে বাদ গেছেন মুসলমান অভিবাসীরা। 

গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ অনুয়ায়ী, সিএএ বাস্তবায়িত হলে মাতুয়ারা নিজেদের ভূমি ও পরিচয় হারাবে বলে গত জানুয়ারিতে সতর্ক করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উল্টো প্রশ্ন রাখেন, “আপনাদের নাগরিকত্ব লাগবে কেন? আপনারা এমনিতেই নাগরিক।”

বিজেপিকে পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি বা সিএএ বাস্তবায়ন করতে দেয়া হবে না বলেও জানান মমতা। 

'দুর্নীতি কোনো ইস্যু নয়'

তৃণমূল থেকে বিজেপিতে যোগ দেয়া মুকুল এবং শুভেন্দুর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, ২০১৪ সালে উন্মোচিত নারদা চিটফান্ড কেলেঙ্কারিতে অংশীদারির। ফলে এই ‘কলুষিত’ নেতাদের বিজেপি-তে যোগদান নিয়ে অখুশি রাজ্য বিজেপির বেশ কিছু বর্ষীয়ান নেতাকর্মী।

তাঁদের মতে, এর ফলে কোনো তফাৎ থাকছে না তৃণমূল এবং বিজেপির মধ্যে। 

এছাড়া ২০২০ সালের বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় আমফান-পরবর্তী সময়ে ত্রাণসামগ্রী তছরুপের অভিযোগ উঠেছে তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধে, সঙ্গে কয়লা, বালি, তোলাবাজি, এবং গরু পাচার চক্র পরিচালনার অভিযোগও। 

বিশেষ করে কয়লা কেলেঙ্কারির কেন্দ্রে রয়েছেন মমতার ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, তদন্ত চলাকালীন তাঁর স্ত্রীকে জেরাও করেছে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই।

তবে নির্বাচনে “এসবের খুব বেশি প্রভাব পড়বে না,” বলে মনে করেন শৈবাল বসু। 

তাঁর মতে, গ্রামবাংলা বরাবরই রাজ্যে যে কোনো নির্বাচনের নির্ণায়ক, সেখানে মানুষের সবচেয়ে বড়ো চিন্তা হলো অন্নসংস্থান। দুর্নীতি কোনো ইস্যু নয়।” 

বর্তমানে বিধানসভায় বসেন মোট ২৯৪ জন বিধায়ক, যাঁদের মেয়াদ হয় পাঁচ বছর। সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনীয় আসন সংখ্যা ১৪৮। বর্তমানে তৃণমূলের রয়েছে ২০০টি ও বিজেপির ৩৫টি আসন। 

পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি এবার নির্বাচন হচ্ছে আসাম, তামিলনাডু, কেরালা রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুদুচেরিতে।

মন্তব্য (0)

সব মন্তব্য দেখুন.

মন্তব্য করুন

নিচের ঘরে আপনার মন্তব্য লিখুন। মন্তব্য করার সাথে সাথে তা প্রকাশ হয় না। একজন মডারেটর অনুমোদন দেবার পর মন্তব্য প্রকাশিত হয়। বেনারনিউজের নীতিমালা অনুসারে প্রয়োজানে মন্তব্য সম্পাদনা হতে পারে। প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য বেনারনিউজ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয়বস্তুর সাথে প্রাসঙ্গিক থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন