Follow us

বিজেপির রাজনৈতিক কর্মসূচির অনুমতি নিয়ে আদালতের হস্তক্ষেপ

পরিতোষ পাল
ঢাকা
2018-12-07
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
কলকাতায় ভারতীয় জনতা পার্টির যুব সংগঠন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও দলীয় সভাপতি অমিত শাহর প্রতিকৃতিসহ মিছিল করে। ১১ আগস্ট ২০১৮। [এপি]
কলকাতায় ভারতীয় জনতা পার্টির যুব সংগঠন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও দলীয় সভাপতি অমিত শাহর প্রতিকৃতিসহ মিছিল করে। ১১ আগস্ট ২০১৮। [এপি]
[এপি]

হিন্দুবাদী ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) ‘গণতন্ত্র বাঁচাও যাত্রা’ নামে ৪১ দিনের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তি নিয়ে বিরোধের প্রেক্ষিতে আদালতকে হস্তক্ষেপ করতে হলো।

শুক্রবার কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়ে দিয়েছে, আগামী বুধবারের মধ্যে রাজ্য সরকারের তিন সর্বোচ্চ আধিকারিককে বিজেপির তিন প্রতিনিধির সঙ্গে বসে রথযাত্রার কর্মসূচি চূড়ান্ত করতে হবে এবং শুক্রবারের মধ্যে তা সরকারকে জানাতে হবে। সেই সঙ্গে বিচারপতি বিশ্বনাথ সমাদ্দারের ডিভিশন বেঞ্চ এর আগে দেওয়া সিঙ্গল বেঞ্চের নির্দেশকে অগ্রহণযোগ্য বলে খারিজ করে দেন।

গত বৃহস্পতিবার বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তীর সিঙ্গল বেঞ্চ বিজেপির যাত্রা কর্মসূচিতে ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত স্থগিতাদেশ জারি করেন। এই নির্দেশের বিরুদ্ধেই বিজেপি ডিভিশন বেঞ্চে যায়।

এদিনের রায়কে ভারতের আইনি ব্যবস্থার জয় আখ্যা দিয়ে বিজেপি নেতা জয়প্রকাশ মজুমদার সাংবাদিকদের বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মিটিং মিছিলের অধিকার হরণ করা যায় না।

আগামী লোকসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক তিনটি রথযাত্রার আয়োজন করে। আইনি জটিলতার কারণে এই রথযাত্রা স্থগিত রাখা হলেও এদিন কোচবিহারে নির্ধারিত এক জনসভায় বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ বলেন, “গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে। বিজেপি কর্মীদের কোনো রাজনৈতিক তৎপরতা চালাতে দেওয়া হচ্ছে না।”

উত্তরবঙ্গের কোচবিহার থেকে শুক্রবার ‘গণতন্ত্র বাঁচাও যাত্রা’ নামে রথের আকারে তৈরি একটি বাসযাত্রার সূচনা করার কথা ছিল ভারতীয় জনতা পার্টির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহর। তবে আইনগত জটিলতার কারণে সেই যাত্রা স্থগিত রেখে অমিত শাহ তাঁর সফর বাতিল করেন।

নয়াদিল্লিতে শুক্রবার দুপুরে এক সাংবাদিক সম্মেলনে অমিত শাহ বলেন, “যতই বলপ্রয়োগের চেষ্টা হোক না কেন, পশ্চিমবঙ্গে তিনটি যাত্রাই হবে। আমি নিজে সেই যাত্রায় অংশ নেব।”

তিনি অভিযোগ করেছেন, “রাজ্যের সাম্প্রতিক পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিজেপির সাফল্য দেখে তৃণমূল কংগ্রেস ভয় পেয়ে গিয়েছে। আর এই যাত্রা সম্পূর্ণ হলে রাজ্যে বিজেপির সমর্থনের ঢেউ উঠবে। এই ভয়েই যাত্রা বন্ধ করতে চেয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস।”

বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ কমিটির সাধারণ সম্পাদক সায়ন্তন বসু বেনারকে বলেন, ‘গণতন্ত্র বাঁচাও যাত্রা’ শান্তিপূর্ণভাবে পালন করার কথা জানিয়ে রাজ্য সরকারকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সরকার এক মাসেও কোনো উত্তর দেয়নি। আর এ জন্য বিজেপিকে আদালতে যেতে হয়।”

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা

আদালতে রাজ্য সরকারের পক্ষে অ্যাডভোকেট জেনারেল (এজি) কিশোর দত্ত বলেন, এই যাত্রা হলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ক্ষুণ্ন হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কোচবিহারের পুলিশ সুপার। জেলা শাসকের রিপোর্টেও অশান্তির আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে বলে এজি আদালতে জানান।

রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তরে পাঠানো জেলা শাসকের রিপোর্টের উল্লেখ করে এজি বলেন, কোচবিহার জেলা স্পর্শকাতর বলে জেলা শাসক জানিয়েছেন। তা ছাড়া সেখানে সাম্প্রদায়িক হানাহানির ইতিহাস রয়েছে বলেও রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী রবীন্দ্রনাথ ঘোষ কোচবিহার থেকে মুঠোফোনে বেনারকে বলেন, “বিজেপির জনসমর্থন যখন দেশজুড়ে তলানীতে এসে ঠেকেছে তখনই এই ধরনের রথযাত্রার আয়োজন করা হয়েছে। আসলে এসব ধর্মের সুড়সুড়ি দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়।”

তিনি বলেন, “ওদের রথ গণতন্ত্রের নয়, দাঙ্গার।”

একই কথা বলেন, তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ পার্থপ্রতিম রায়। তিনি বলেন, “বিজেপির এই কর্মসূচি মোটেই গণতান্ত্রিক নয়। এটা পুরোপুরিভাবেই সাম্প্রদায়িক কর্মসূচি।”

রাজ্যের মন্ত্রী এবং জমিয়তে উলেমা হিন্দের রাজ্য সভাপতি সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী বিজেপির উদ্দেশ্যে বার্তা দিয়ে বলেন, “সংবিধানে স্বীকৃত অধিকার এবং সম্প্রীতির বাতাবরণ ধ্বংসের চেষ্টা হলে কড়া প্রতিবাদ জানানো হবে।”

গণতন্ত্র নেই অভিযোগ

তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগের পাল্টা বিজেপি নেতা সায়ন্তন বসু বলেন, “পশ্চিমবঙ্গে তো আইন-শৃঙ্খলাই ভেঙে পড়েছে। বিজেপি কর্মীদের ওপর চলছে শাসক দলের লাগামছাড়া অত্যাচার। রাজ্যে পঞ্চায়েত নির্বাচনে ব্যাপক হিংসার ঘটনা ঘটেছে। প্রায় ৭০জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৩০ জনই বিজেপির দলীয় কর্মী।”

তিনি আরও বলেন, “পশ্চিমবঙ্গে যে কোনো গণতান্ত্রিক পরিবেশ অবশিষ্ট নেই সেটা তুলে ধরার পাশাপাশি গোটা ভারতে এ ব্যাপারে বার্তা দিতেই সর্বভারতীয় বিজেপি নেতাদের এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করার কথা।”

রথের আকারে তৈরি তিনটি শীততাপনিয়ন্ত্রিত বাসে বিজেপির শীর্ষ নেতারা ৪১ দিন ধরে রাজ্যের ৪২টি লোকসভা কেন্দ্র ঘুরে রাজ্যে গণতন্ত্র কীভাবে ধ্বংস হয়েছে সে সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার কর্মসূচি পালন করবেন বলে ঠিক করেন।

'বিজেপির রাজনৈতিক কৌশল'

নির্বাচনের আগে রথযাত্রা বিজেপির রাজনীতিতে নতুন নয়। প্রায় তিন দশক আগে লালকৃষ্ণ আদভানির নেতৃত্বে প্রথম দেশজুড়ে রথযাত্রা হয়েছিল। এই ধরনের রথযাত্রার উন্মেষ নির্বাচনের রাজনৈতিক প্রচারাভিযান ছাড়া আর কিছু নয় বলে মনে করেন রাজনৈতিক পর্যক্ষেকরা।

পর্যবেক্ষকদের মতে, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে গেরুয়া (বিজেপির রং) ঝড় তুলতে মরিয়া বিজেপি শিবির। আর তাই রথযাত্রার মাঝেই দফায় দফায় পশ্চিমবঙ্গে আসার কথা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সহ বিভিন্ন বিজেপি শাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদেরও।

আগামী এপ্রিল-মে মাসে ভারতে অনুষ্ঠিত হবে লোকসভার নির্বাচন। লোকসভার আসনসংখ্যার বিচারে পশ্চিমবঙ্গ তৃতীয় বেশি সংখ্যক (৪২) আসনের রাজ্য।

গত লোকসভা নির্বাচনে রাজ্যে বিজেপি ২ টি আসন পেয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিজেপি ৭ হাজার আসনে জয়ী হযেছে। রাজ্যে তাদের ভোট একসময় যেখানে ৩ শতাংশ ছিল বর্তমানে তা প্রায় ২৪ শতাংশে উঠে এসেছে। এই অবস্থায় বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ রাজ্যে ২৩টি লোকসভা আসন পাবার লক্ষ্যও নির্ধারণ করেন।

শুক্রবারও সাংবাদিকদের কাছে অমিত শাহ দাবি করেন, “পশ্চিমবঙ্গে পরিবর্তন সুনিশ্চিত। রাজ্যের মানুষই এই পরিবর্তন চাইছেন।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিমল শংকর নন্দ বেনারকে বলেন, “বিজেপি রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেই পশ্চিমবঙ্গে প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে গণতন্ত্র বাঁচাও যাত্রার মাধ্যমে প্রচারে ঝাঁপিয়ে পড়তে চেয়েছে।”

তিনি বলেন, “আগামী লোকসভা নির্বাচনে উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ ভারত থেকে বেশি সংখ্যক আসন পাওয়ার লক্ষ্যে বিজেপি সব রকম প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে। আর সে ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের গুরুত্ব তাদের কাছে অনেক বেশি।”

তিনি আরও বলেন, “প্রাতিষ্ঠানিক বিরোধিতার কারণেই উত্তর, মধ্য ও পশ্চিম ভারতের রাজ্যগুলোতে বিজেপির আসন খোয়ানোর যে সম্ভাবনা রয়েছে, সেই ঘাটতি পূরণ করতেও বিজেপি পশ্চিমবঙ্গকে টার্গেট করা শুরু করেছে করেছে।”

“পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস বিজেপির এই রথযাত্রা মোকাবিলায় যেভাবে দলীয় কর্মীদের মাঠে নামিয়েছে, প্রশাসনিকভাবে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছে তাতে মনে হচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস বেশ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে”, বলেন অধ্যাপক নন্দ।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন