ভারতে নির্যাতিত বাংলাদেশি তরুণী, পাচারকারী ‘টিকটক হৃদয়’ গুলিবিদ্ধ

পুলক ঘটক ও পরিতোষ পাল
ঢাকা ও কলকাতা
2021-05-28
Share
ভারতে নির্যাতিত বাংলাদেশি তরুণী, পাচারকারী ‘টিকটক হৃদয়’ গুলিবিদ্ধ এক বাংলাদেশি তরুণীকে ভারতে পাচারের পর পৈশাচিক কায়দায় নির্যাতনের অভিযোগে গ্রেপ্তার বাংলাদেশি রিফাতুল ইসলাম হৃদয়কে (মাঝখানে) তার নিজের তৈরি করা ভিডিও দেখাচ্ছে ব্যাঙ্গালুরু পুলিশ। ২৭ মে ২০২১।
[ফোকাস বাংলা]

পৈশাচিক কায়দায় এক তরুণীকে পাচারের পর নির্যাতনের অভিযোগে ভারতে গ্রেপ্তার বাংলাদেশি রিফাতুল ইসলাম হৃদয় (২৬) ও তাঁর এক সহযোগী পালানোর চেষ্টাকালে শুক্রবার কর্ণাটক পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। হৃদয় ‘টিকটক হৃদয়’ নামে পরিচিত। 

বাংলাদেশ থেকে পাচার করা ওই তরুণীকে বীভৎসভাবে নির্যাতন করার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর গত এক সপ্তাহে ভারত ও বাংলাদেশে আলোড়ন সৃষ্টি হয়।

নির্যাতনকারী হৃদয়ের ভারতে অবস্থান চিহ্নিত করে বাংলাদেশ পুলিশ। এরপর হৃদয়সহ ছয় জনের একটি দলকে বৃহস্পতিবার রাতে গ্রেপ্তার করে কর্ণাটক রাজ্যের ব্যাঙ্গালুরু পুলিশ। এদের মধ্যে দুই জন নারী।

এক টুইট বার্তায় ব্যাঙ্গালুরু পুলিশ কমিশনার কমল পন্থ জানান, গ্রেপ্তারকৃত সবাই একই চক্রের সদস্য এবং খুব সম্ভবত সবাই বাংলাদেশি। যদিও বাংলাদেশ পুলিশ এখন পর্যন্ত হৃদয় এবং নির্যাতিতা বাংলাদেশি বলে নিশ্চিত করেছে।

ওই তরুণীকে পাচারের উদ্দেশ্যে ভারতে আনা হয় জানিয়ে তিনি বলেন, আর্থিক বিষয়ে মতবিরোধের কারণেই তরুণীর ওপর নির্যাতন করা হয়।

অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে স্থানীয় থানায় ধর্ষণ ও নির্যাতনের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে বলেও জানান পুলিশ কমিশনার। 

পালাতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ

বাঙ্গালুরুর ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (পূর্ব) শারানাপ্পা সংবাদ মাধ্যমকে জানান, শুক্রবার ভোরে অভিযুক্তদের ঘটনাস্থলে নিয়ে গেলে সেখান থেকে তাঁরা পালাবার চেষ্টা করে। এসময় পুলিশ গুলি চালালে টিকটক হৃদয় ও সাগর নামে একজন গুলিবিদ্ধ হন। তাঁদের একটি সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

কয়েকদিন আগে অভিযুক্তরাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁদের আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের বন্ধুদের কাছে নির্যাতনের ভিডিওটি ছড়িয়েছিল বলে এক প্রতিবেদনে জানায় ভারতের দৈনিক দ্য হিন্দু। সেখান থেকেই পরবর্তীতে ভিডিওটি ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে পড়ে। 

ভাইরাল ভিডিওটি দেখার পর ঘটনাটি কোথায় এবং কবে ঘটেছে তা জানা নেই উল্লেখ করে ছয়জনের মধ্যে পাঁচ দুষ্কৃতকারীর ছবি দিয়ে আসাম পুলিশ বৃহস্পতিবার টুইটারে এ সম্পর্কে কারো কাছে কোনো তথ্য থাকলে জানানোর অনুরোধ করে। 

পরবর্তীতে বাংলাদেশের পুলিশের দেয়া তথ্য ও সহযোগিতার ভিত্তিতেই ব্যাঙ্গালুরু পুলিশ এই অপরাধী চক্রকে গ্রেপ্তার করেছে বলে জানান ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার মো. শহিদুল্লাহ। 

“ভাইরাল হওয়া ভিডিওর ভিত্তিতে তদন্ত চালিয়ে আমরা প্রথমে এক নম্বর অপরাধী টিকটক হৃদয় বাবুকে চিহ্নিত করতে সক্ষম হই। কৌশলে তার মামার হোয়াটসঅ্যাপে নাম্বার থেকে যোগাযোগ করে তার অবস্থানও নির্ণয় করি,” বলেন শহিদুল্লাহ।

তিনি বলেন, “আমাদের প্রাপ্ত তথ্য ব্যাঙ্গালুরুর রামমূর্তি নগর থানায় দেওয়া হয়। এরপর একে একে অভিযুক্ত চার তরুণ ও দুই নারীকে গ্রেপ্তার করে সেখানকার পুলিশ।”

“টিকটক ভিডিও বানিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘টিকটক হৃদয় বাবু’ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠা রিফাত নারীদের প্রলুব্ধ করে পাচারের মতো অপকর্মে লিপ্ত ছিল,”  জানান তিনি।

গ্রেপ্তার অন্য তিন পুরুষ হলেন হলেন মোহাম্মদ বাবা শেখ, সাগর ও অখিল। গ্রেপ্তারকৃত দুই নারীর পরিচয় এখনো প্রকাশ করা হয়নি। 

এই ঘটনায় দুই দেশেই মামলা ও তদন্ত চলবে বলে জানিয়েছেন উভয় দেশের পুলিশ কর্মকর্তারা। জড়িতদের কঠোর শাস্তি দেওয়ার কথা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী বি এস ইয়েদিইউরাপ্পা। 

পাচারের পর যৌনপল্লিতে বিক্রি

ঘটনাটি ঘটে ভারতের বেঙ্গালুরুর বনসওয়াদির চান্নাসান্দ্রা এলাকায় সপ্তাহদুয়েক আগে। সেখানে বিবস্ত্র করে ওই তরুণীকে নির্যাতন করা হয়, তাঁর গোপনাঙ্গে মদের বোতল ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। সেই ভিডিও ধারণ করে তা ছড়িয়ে দেয়া হয় ফেসবুকে।

ওই ভিডিও পর্যালোচনা করে নির্যাতনকারী একজনের সঙ্গে হাতিরঝিল এলাকার এক যুবকের চেহারার মিল পাওয়ায় বাংলাদেশ পুলিশ তাঁর বাসা খুঁজে বের করে।

হৃদয়ের মা মিনু আক্তার ও মামা ফরহাদ হোসেনকে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে তাঁরা স্বীকার করেন ভিডিওতে হৃদয় রয়েছে। পরে কৌশলে ফরহাদের মাধ্যমে যোগাযোগ করিয়ে ভারতে হৃদয়ের অবস্থান নিশ্চিত করে পুলিশ।

পুলিশ জানায়, মগবাজার ও হাতিরঝিল এলাকায় টিকটক হৃদয়কে সবাই বখাটে হিসেবে চিনে। হৃদয় অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। ওই নারীকে পাচার করে ভারতের একটি যৌনপল্লিতে বিক্রি করে দিয়েছিলেন হৃদয়।

মগবাজারের মোফাখ্খারুল হাসান নামে একজন তরুণ বেনারকে জানান, হৃদয় বিভিন্ন এলাকা থেকে মেয়েদের নিয়ে হাতিরঝিলে টিকটক বানাতেন।

সৌদি গিয়ে ভাগ্য বদলের স্বপ্ন 

বাংলাদেশ পুলিশ এবং নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কিশোরগঞ্জ জেলার গ্রামাঞ্চলে একটি দরিদ্র পরিবারে জন্ম হয়েছিল মেয়েটির।

“টাকার অভাবে মেয়েকে বেশি দূর পড়াশোনা করাতে পারিনি, তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত সে পড়েছে,” বেনারকে জানিয়েছেন নির্যাতিতার বাবা।

২০১৪ সালে তাঁর মেয়ের চাঁদপুরের এক কুয়েত প্রবাসীর সাথে বিয়ে হয়েছিল। জানিয়ে মেয়েটির বাবা বলেন, “কিন্তু শ্বশুরবাড়ির অত্যাচারে টিকতে না পেরে পাঁচ বছর সে আমার কাছেই ছিল, স্বামী খোঁজ নিত না।”

“আমার মেয়ের চার বছরের একটি ছেলে আছে, সে চাঁদপুরে ওর দাদা–দাদির সাথে থাকে,” যোগ করেন তিনি।

তিনি বলেন, অভাবের কারণে তাঁর মেয়ে সৌদি আরবে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ঢাকায় এসে “কয়েক মাস হাতিরঝিল এলাকায় ছিল।” 

“এরই মধ্যে হৃদয়ের পাল্লায় পড়ে সে। হৃদয় ওকে সৌদি আরব পাঠানোর স্বপ্ন দেখিয়েছিল। এরপর প্রায় এক বছর হলো মেয়ের খোঁজ পাই না,” জানান তিনি। 

হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আব্দুর রশীদ বলেছেন, টিকটক হৃদয়সহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করে বৃহস্পতিবার রাতে মামলা করেছেন মেয়েটির বাবা।

“আমরা জানতে পেরেছি, হৃদয় তাকে ভালো বেতনে চাকরিসহ বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে অবৈধভাবে ভারতে পাচার করে। এরপর যৌন্নপল্লিতে বিক্রি করে দেয়,” বলেন তিনি।

হৃদয়ের চাচা বাবুল মিয়া সাংবাদিকদের বলেছেন, যৌন নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর বুধবার রাতে হাতিরঝিল থানা পুলিশ হৃদয়ের বাসায় গিয়ে তল্লাশি চালায়।

মন্তব্য (0)

সব মন্তব্য দেখুন.

মন্তব্য করুন

নিচের ঘরে আপনার মন্তব্য লিখুন। মন্তব্য করার সাথে সাথে তা প্রকাশ হয় না। একজন মডারেটর অনুমোদন দেবার পর মন্তব্য প্রকাশিত হয়। বেনারনিউজের নীতিমালা অনুসারে প্রয়োজানে মন্তব্য সম্পাদনা হতে পারে। প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য বেনারনিউজ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয়বস্তুর সাথে প্রাসঙ্গিক থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন