Follow us

‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’: পোশাকের বার্তায় তোলপাড়

প্রাপ্তি রহমান
ঢাকা
2019-04-12
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’ বার্তাসহ টি-শার্ট এর বিজ্ঞাপন। ৩ এপ্রিল ২০১৯।
‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’ বার্তাসহ টি-শার্ট এর বিজ্ঞাপন। ৩ এপ্রিল ২০১৯।
[সৌজন্যে: বিজেন্স]

উদ্যোক্তারা বলছেন, নারীরা প্রতিনিয়ত গণপরিবহনে যে যৌন হয়রানির শিকার হন, তার প্রতিবাদে একটা বার্তা দেওয়াই ছিল মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু টি-শার্টে ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’—বার্তাটি যে এতটাই তোলপাড় সৃষ্টি করবে তা বুঝতে পারেননি তাঁরা।

সাম্প্রতিক বাংলাদেশে কোনো পোশাকের বার্তা নিয়ে এত আলোচনা-সমালোচনা হয়নি। ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’ লেখা টি শার্টটির ডিজাইনার বিজেন্স নামে একটি প্রতিষ্ঠান।

কথা হচ্ছিল বিজেন্স এর অন্যতম সত্ত্বাধিকারী ও ডিজাইনার জিনাত জাহান নিশার সঙ্গে। বেনারকে তিনি জানান, ঢাকার একটি মেলায় অংশ নিতে এই বার্তা দিয়ে মাত্র ৩৫ পিস টি শার্ট তৈরি করেছিলেন।

“বাসে হয়রানির শিকার হওয়ার পর আমি নিজেই গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না লিখে একটা খোঁপার কাঁটায় ডিজাইন করেছিলাম। এ বছর নতুন করে কিছু টি শার্ট করলাম। গণপরিবহনে হয়রানির শিকার হওয়ার বিষয়টটি মাথায় রেখে​ এটা করা,” জিনাত জাহান বেনারনিউজকে বলছিলেন।

গত ৫ এপ্রিল ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’ এমন টি শার্ট পরা দুই নারীর বাসে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপলোড করে বিজেন্স। কিছুক্ষণের মধ্যেই ছবিটি ভাইরাল হয়ে যায় এবং বিষয়টির পক্ষে-বিপক্ষে দুটি দল দাঁড়িয়ে যায়।

জিনাত জানান, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এখন ফেসবুকে তাঁর আইডি নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া থেকে শুরু করে চাপাতি প্রস্তুত বলেও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। পুরো বিষয়টিতে তাঁদের এত বেশি সময় দিতে হচ্ছে যে, বৈশাখের শাড়ি, অন্যান্য পরিধেয় ও অলঙ্কারের ব্যবসা সামাল দিতে পারছেন না।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের গণপরিবহনে নারীরা প্রায়ই যৌন হয়রানির শিকার হন। গত বছর বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক ‘নারীর জন্য যৌন হয়রানি ও দুর্ঘটনামুক্ত সড়ক’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয় দেশের গণপরিবহনে যাতায়াতের সময় ৯৪ শতাংশ নারী মৌখিক, শারীরিক বা অন্য যেকোনো ভাবে হয়রানির শিকার হয়ে থাকেন।

টি শার্ট নিয়ে যত আলোচনা

বিজেন্স ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ঘুরে দেখা গেছে, গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না—এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনায় যুক্ত হয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার নারী-পুরুষেরা। একাধিক পক্ষ বিষয়টি নিয়ে ফেসবুকে সক্রিয়।

কেউ বাহবা দিচ্ছেন, কেউ বলছেন পর্দা প্রথা জারি হলে নারীরা হয়রানির শিকার হবেন না। আবার তাঁদের বিপক্ষে বোরখা ও নেকাব পরা এক নারী লিখেছেন, গণপরিবহনে বোরখা-নেকাব পরেও হয়রানি থেকে বাঁচতে পারেননি তিনি।

আলোচনায় অংশ নিয়ে দেশান্তরিত লেখক তসলিমা নাসরিন তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে মতামত প্রকাশ করেছেন।

“গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’ লেখা টিশার্ট বাংলাদেশের কিছু মেয়ে পরছে। এ রকম টি শার্ট আরও মেয়ের পরা উচিত,” তসলিমা নাসরিন লিখেছেন।

জবাবে রাহুল রায় চৌধুরী লিখেছেন, ‘টি-শার্ট দেখেছি। পুরুষবিদ্বেষী। খুব সস্তা চিন্তাভাবনা-এটুকুই মনে হয়েছে।”

পিসফুল টিভি নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলে মুফতি আবু সালেহ নায়েব আলী ১৫ মিনিট দীর্ঘ একটি ওয়াজ করেছেন। সেই ওয়াজের মোদ্দাকথা হলো, গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না লেখা টি-শার্ট ধর্ষণকে উসকে দেবে। পর্দাই একমাত্র নারীদের রক্ষা করতে পারে বলে মন্তব্য তাঁর।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রী ইসরাত জাহান লিখেছেন, ছয় বছর হয় তিনি বোরখা ও নেকাব পরেন। তাঁর অভিজ্ঞতা হলো, বোরখা পরা মেয়েরা ভিড়ের মধ্যে বাসে আরও অনেক বেশি হয়রানির শিকার হয়।

“বিলিভ মি, বোরখা পরা মেয়েরা ভিড়ের মধ্যে আর বাসে আরও বেশি হয়রানির শিকার হয়। কোনোদিন আপনার ভদ্র শালীন গা ঢেকে মাথা নিচু করে চলা বোনটাকে অভয় দিয়ে কাছে ডেকে এনে জিজ্ঞাসা করে দেখবেন একদিন? সে কতদিন এরকম হয়রানির শিকার হয়েছে,” ইসরাত জাহান লেখেন।

যারা এই টি-শার্টের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন তাঁদের উদ্দেশ্যে একমুখী চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসার অনুরোধ করেছেন ইসরাত। তিনি মনে করেন, এই ভাবনা বিকৃতমনাদেরও মা-বোনদের গায়ে হাত দেবার সাহস যোগাবে।

কেন এত হৈ চৈ

সাম্প্রতিক সময়ে কোনো বার্তা নিয়ে এত হৈ চৈ হয়নি। এর কারণ কী? কথা হচ্ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌসের সঙ্গে। তিনি বলছিলেন, টি শার্ট ইস্যুতে আবারও প্রমাণ হলো, আপাত প্রগতিশীল এবং মোল্লা দু পক্ষের ভেতরেই পুরুষতান্ত্রিকতা রয়ে গেছে।

“দেখুন প্রতিকী এই বার্তা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে দেখা গেল, আপাত প্রগতিশীল ও মোল্লাদের সুর একই। দু’দলই দু’ধরনের যুক্তি দিয়ে কথা বলছে। কিন্তু ভেতর থেকে তাদের তাড়িত করছে পুরুষতন্ত্র। অথচ, মেয়েরা গণপরিবহনে হয়রানির শিকার হন—এটা মেনে নিয়ে বিষয়টিকে সাধুবাদ দেওয়া উচিত ছিল,” রোবায়েত ফেরদৌস বেনারনিউজকে বলেন।

এ দিকে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের চেয়ারম্যান মো. মিজানুর রহমানের ব্যাখ্যাটা ছিল একটু আলাদা। তিনি বলছিলেন, এ কথা সত্য যে বাংলাদেশের গণপরিবহনে ‘ব্যক্তিগত স্পেস’ বলে কিছু থাকে না, পুরুষদেরও না। নারীরা বরং একটু বেশিই ঝামেলা পোহান। কিন্তু বার্তাটা ঠিক পরিষ্কার নয়।

“মার্কেটিংয়ের ছাত্র হিসেবে যদি বলেন, বার্তাটা পরিষ্কার নয়। কী বোঝাতে চাইছেন, সেটা পরিষ্কার না হলে নানা রকম আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়। এখানেও তাই হয়েছে,” মিজানুর রহমান বেনারনিউজকে বলেন।

তবে যে চিন্তা থেকে টি শার্টটি তৈরি সেটি ইতিবাচক ছিল বলে মন্তব্য তাঁর।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন