Follow us

ধর্ষকের সাথে থানায় বিয়ে আয়োজন করা দুই পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2019-09-12
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
সারাদেশে ধর্ষণ, হত্যা, নারী ও শিশু নির্যাতনের প্রতিবাদে পাবনায় মানবাধিকার কর্মীদের মানবন্ধন। ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯।
সারাদেশে ধর্ষণ, হত্যা, নারী ও শিশু নির্যাতনের প্রতিবাদে পাবনায় মানবাধিকার কর্মীদের মানবন্ধন। ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯।
[নিউজরুম ফটো]

পাবনায় দল বেঁধে ধর্ষণের অভিযোগকারী এক নারীকে থানায় ডেকে অভিযুক্তের সাথে বিয়ে দেয়ার ঘটনায় জড়িত দুই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে জেলা পুলিশ।

পাবনার পুলিশ সুপার শেখ রফিকুল ইসলাম জানান, ওই ঘটনায় জড়িত থাকায় পাবনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওবাইদুল হককে প্রত্যাহার করা হয়েছে। আর বিয়ে আয়োজনে সহযোগিতা করার অভিযোগে সাব-ইন্সপেক্টর একরামুল হককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

তিনি বেনারকে বলেন, “ওই ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার প্রেক্ষিতে তাঁদের বিরুদ্ধে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলো।”

বিভাগীয় তদন্ত শেষে তাঁদের বিরুদ্ধে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান পুলিশ সুপার।

তবে মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, প্রত্যাহার বা বরখাস্ত করা কোনো শাস্তি নয়। তাঁরা যে অপরাধ করেছেন, তার শাস্তি দেশের প্রচলিত আইনে হতে হবে।

মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবী সালমা আলী বেনারকে বলেন, “পুলিশের এই ধরনের অপকর্ম একটার পর একটা ঘটেই যাচ্ছে। তাদের প্রত্যাহার বা বরখাস্ত করা কোনো শাস্তি নয়। দেশের আইন অনুযায়ী তাদের বিচার হতে হবে।”

তিনি বলেন, “পুলিশ ধর্ষণের মামলা না নিয়ে বিবাহিত মহিলাকে আবার ধর্ষকের সাথে বিয়ে দিয়েছে। তারা ধর্ষককে বাঁচাতে চেয়েছে। তাই ধর্ষকদের পাশাপাশি এই পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও মামলা করতে হবে।”

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পাবনা জেলা শাখার সভাপতি পূরবী মৈত্র বেনারকে বলেন, “প্রশাসনের উপস্থিতিতে বিচার না করে ধর্ষকের সাথে অভিযোগকারীর বিয়ে দেওয়া সামাজিক মীমাংসার নামে প্রহসন।”

“থানায় এ ধরনের ঘটনা ধর্ষককে উৎসাহিত করার সামিল। আমরা এই ঘটনার সাথে জড়িতদের উপযুক্ত শাস্তি চাই,” বলেন তিনি।

অভিযোগকারী নারীর বাবা সামাদ মাঝি বেনারকে বলেন, “যারা আমার মেয়ের সাথে এই জঘন্য অপরাধ করেছে আমি তাদের শাস্তি চাই।”

ওই নারীর ভাই মোশাররফ মাঝি বেনারকে বলেন, “আমার বোন থানায় গিয়েছিল মামলা করতে। তার মেডিকেল করানোর কথা বলে রাতে তাকে থানায় রাখা হয়। পরদিন শুনি তাকে প্রধান আসামির সাথে বিয়ে দিয়েছে।”

ওই নারীর তিনটি সন্তান রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “পুলিশ কীভাবে একজন বিবাহিত নারীকে আবার বিয়ে দিতে পারে বা তার আগের স্বামীর সাথে ডিভোর্স দিতে পারে? আমরা এই বিয়ে মানি না। ধর্ষকদের পাশাপাশি এই পুলিশদেরও কঠিন শাস্তি চাই আমরা, যাতে সমাজে এ ধরনের অপরাধ আর না ঘটে।”

এদিকে পাবনার পুলিশ সুপার রফিকুল ইসলাম বলেন, ধর্ষণের ওই ঘটনায় মামলা হয়েছে। এজাহারভুক্ত পাঁচ আসামির মধ্যে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

এরা হচ্ছেন; রাসেল আহমেদ, মো. সঞ্জু, হোসেন আলী ও সদর উপজেলার দাপুনিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ঘন্টু।

আসামিদের মধ্যে রাসেল ও হোসেন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকোরোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানান তিনি।

ভুক্তভোগী নারীর অভিযোগ, গত ২৯ আগস্ট রাসেল তাঁকে তার বাড়িতে নিয়ে এক সহযোগীসহ পালা করে ধর্ষণ করে। এর দুদিন পর তাঁকে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অফিসে নিয়ে তিন দিন আটকে রেখে আরও চার-পাঁচজন পালা করে ধর্ষণ করে।

সেখান থেকে পালিয়ে এসে ওই নারী নিজেই বাদী হয়ে পাবনা থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। পরে পুলিশ রাসেলকে আটক করলেও মামলা নথিভুক্ত না করে ওই নারীর সাথে বিয়ে দেয়। থানাতেই এই বিয়ের আয়োজন করা হয়।

বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পরে পুলিশ কর্তৃপক্ষ ওসি ওবাইদুল হককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে পরে থানায় মামলা নেওয়া হয়। তিন সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করে ঘটনা তদন্ত করে পুলিশ।

জেলা প্রশাসনের পৃথক তদন্ত কমিটি

এদিকে ধর্ষকের সঙ্গে অভিযোগকারীর বিয়ে দেওয়ার ঘটনায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশে আরও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাবনা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই কমিটি করা হয় বলে বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের জানান জেলা প্রশাসক কবীর মাহমুদ।

তিনি বলেন, ঘটনার সত্যতা অনুসন্ধানে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশে তিন সদস্যের এই কমিটি গঠন করা হয়েছে। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জাহিদ নেওয়াজের নেতৃত্বে কমিটিতে আরো রয়েছেন সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবনে মিজান ও ডেপুটি সিভিল সার্জন কে এম আবু জাফর।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন