Follow us

মাহাথিরের পদত্যাগ: মালয়েশিয়ার শ্রম বাজার খোলা অনিশ্চিত

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2020-02-24
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের সাথে তাঁর কার্যালয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন বাংলাদেশ সফররত মালয়েশীয় মানবসম্পদমন্ত্রী এম কুলাসেগারান। ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০।
ঢাকায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের সাথে তাঁর কার্যালয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন বাংলাদেশ সফররত মালয়েশীয় মানবসম্পদমন্ত্রী এম কুলাসেগারান। ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০।
[ফোকাস বাংলা]

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের আকস্মিক পদত্যাগে ভেস্তে গেলো বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার প্রক্রিয়া।

কীভাবে এবং কত তাড়াতাড়ি শ্রমবাজার উন্মুক্ত করা যায় সেব্যাপারে যৌথ কর্ম গ্রুপের সভা হওয়ার কথা ছিল মঙ্গল ও বুধবার। কিন্তু মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের কারণে সেই সভা বাতিল হয়ে গেছে বলে বেনারকে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইমরান আহমদ।

তিনি জানান, যৌথ কর্ম গ্রুপের সভায় অংশগ্রহণের জন্য ঢাকায় আগত মালয়েশীয় কর্মকর্তারা সোমবার দেশে ফিরে গেছেন।

যৌথ কর্ম গ্রুপের সভার মূল বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে রোববার ঢাকায় মন্ত্রী ইমরান আহমদের সাথে বৈঠক করেন সফররত মালয়েশীয় মানবসম্পদমন্ত্রী এম কুলাসেগারান।

ইমরান আহমদ বেনারকে বলেন, “মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী আমার সাথে বৈঠকে জানিয়েছেন যে তাঁরা বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য তাঁদের শ্রমবাজার উন্মুক্ত করবেন; এ ব্যাপারে আমরা দুই মন্ত্রী একমত হয়েছি।”

তিনি বলেন, “তবে শ্রমবাজার কীভাবে উন্মুক্ত করা হবে, কখন করা হবে, কত টাকা দিয়ে কর্মীরা যাবেন এ সকল বিষয়সহ অন্যান্য খুঁটিনাটি ঠিক করতে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া যৌথ কর্ম গ্রুপের সভা মঙ্গলবার-বুধবার অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কর্মকর্তারা ঢাকায় এসেছিলেন।”

“কিন্তু হঠাৎ সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল। আমরা আশা রাখি মালয়েশিয়ার নতুন সরকার গঠিত হলে আবার আলোচনা শুরু করব,” বলেন ইমরান আহমদ।

রোববার প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইমরান আহমদের সঙ্গে বৈঠক শেষে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী এম কুলাসেগারান ঢাকায় সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিতে চাই। এজন্য আমি ঢাকায় এসেছি।”

তিনি বলেন, মালয়েশিয়া বর্তমানে কর্মী সংকটে রয়েছে। তাই দ্রুত বাংলাদেশিদের জন্য শ্রমবাজার খুলতে আগ্রহী তাঁরা।

বাংলাদেশিদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার ব্যাপারে গত ৩ থেকে ৬ নভেম্বর মালয়েশিয়ায় দুই দেশের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, ২৪ ও ২৫ নভেম্বর ঢাকায় জয়েন্ট ওয়ার্কিং কমিটির পরবর্তী বৈঠকে এব্যাপারে আলোচনা হবে। কিন্তু শেষ সময়ে নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা দেখিয়ে বৈঠক স্থগিত করে মালয়েশিয়া সরকার।

সেই স্থগিত সভা মঙ্গলবার ‍ও বুধবার অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ সোমবার দেশটির রাজা সুলতান আব্দুল্লাহ রিয়াইয়াতুদ্দিনের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন। নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত রাজা তাঁকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে বলেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ অনুমোদনের পাশাপাশি রাজা মন্ত্রীপরিষদও বিলুপ্ত ঘোষণা করেছেন, ফলে বাংলাদেশ সফররত কুলাসেগারানও আপনা-আপনি তাঁর মন্ত্রীত্ব হারিয়েছেন।

আবারো অনিশ্চিত মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার

জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রার সভাপতি বেনজীর আহমেদ বেনারকে বলেন, “যেহেতু মালয়েশিয়ায় কোনো সরকার নেই সেহেতু এই সভা হওয়ার কোনো কারণ নেই। তবে আমরা যদি একটু সক্রিয় ভূমিকা পালন করতাম তাহলে হয়তো নভেম্বরেই শ্রমবাজার উন্মুক্ত হয়ে যেত। আমাদের এই সঙ্কটে পড়তে হতো না।”

অর্থনৈতিকভাবে উন্নতির কারণে ১৯৭৮ সাল থেকে বাংলাদেশিরা মালয়েশিয়া যেতে শুরু করে। তবে ১৯৯২ সালের পর থেকে মালয়েশিয়ায় বেশি সংখ্যক বাংলাদেশি কাজের সুযোগ পায়।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য মতে ১৯৭৮ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ১০ লাখের বেশি বাংলাদেশি দক্ষ ও অদক্ষ কর্মী মালয়েশিয়ায় কাজ করতে গেছেন। তবে তাঁদের মধ্যে কতজন দেশে ফিরে এসেছেন সেব্যাপারে কোনো তথ্য নেই।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের উন্নয়নের জন্য কাজ করা বেসরকারি সংগঠন ওয়ারবি ডেভেলপ ফাউন্ডেশনের প্রধান সৈয়দ সাইফুল হক বেনারকে জানান, বর্তমানে মালয়েশিয়ায় কমপক্ষে চার লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক রয়েছেন।

তিনি বলেন, “সেখানে অবস্থানরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের একটি বড় অংশের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়েছে বিধায় অবৈধ হয়ে পড়েছেন। তাঁরা বিভিন্ন স্থানে লুকিয়ে অবৈধভাবে কাজ করছেন।”

সাইফুল হক বলেন, মঙ্গলবারের যৌথ কর্ম গ্রুপের সভায় নতুন বাজার উন্মুক্ত করা এবং সেখানে যারা অবৈধ হয়ে পড়েছেন তাঁদের বৈধ করার ব্যাপারে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল।

তিনি বলেন, মালয়েশিয়ায় চাকরির জন্য বাংলাদেশিদের চার-পাঁচ লাখ টাকা খরচ করতে হয়। এই খরচের প্রায় সবটুকুই যায় কয়েকটি হাতেগোনা রিক্রুটিং এজেন্টদের পকেটে।

তাঁর মতে, জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী কর্মীদের কর্মস্থলে আসার টাকা নিয়োগকারীদের বহন করতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশের কর্মীরা নিজেদের টাকা খরচ করে মালয়েশিয়া যায়।

সাইফুল হক বলেন, “বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নিতে মালয়েশিয়ায় একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এরা দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা জনগণের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়।”

তিনি বলেন, মাহাথির মোহাম্মদ ক্ষমতায় এসেই ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ করে দেন। তার কারণ ছিল দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট ধ্বংস করা। সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করা।

“আমাদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার যে সুবর্ণ সুযোগ এসেছিল মাহাথিরের পদত্যাগের কারণে তা আবার অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেলো। আমাদের আরও সময় অপেক্ষা করতে হবে,” বলেন সাইফুল হক।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন