জাতীয় সংসদ: সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধের দাবি

জেসমিন পাপড়ি
2019.11.12
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
191112_Bangladeshi_female_workers_1000.jpg সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে নারী গৃহকর্মী ও শ্রমিক নির্যাতনের প্রতিবাদে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক সংগঠন ও অ্যাক্টিভিস্টদের বিক্ষোভ মিছিল। ১২ নভেম্বর ২০১৯।
[বেনারনিউজ]

নিয়োগকর্তাদের মাধ্যমে শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের নানা অভিযোগ ওঠায় সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধের দাবি উঠেছে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে।

মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের তিনজন সাংসদ এই দাবি জানান। এসব ঘটনায় সাংসদদের সমালোচনার মুখেও পড়েন প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ইমরান আহমদ। এরই প্রেক্ষিতে সৌদিতে পাঠানোর পর তাঁদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে নারী কর্মী না পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলে জানান তিনি।

সাংসদের সমালোচনার জবাবে ইমরান আহমদ বলেন, সৌদি আরবে নারী গৃহকর্মীদের সমস্যার বিষয়টি নিয়ে সরকারও চিন্তিত। তাঁদেরকে প্রশিক্ষণসহ নানা সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”

আর একেবারেই সম্ভব না হলে নারী কর্মী না পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলে জানান তিনি।

তবে অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নারী কর্মী পাঠানো বন্ধ করা নয়, বরং তাঁদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই হবে সমাধান।

রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) সিনিয়র গবেষক ড. জালাল উদ্দিন সিকদার বেনারকে বলেন, “নারী কর্মী পাঠানো বন্ধ করা উচিত হবে না। এতে বিদেশে সফল হওয়া প্রবাসী নারীদের সাথে অন্যায় করা হবে।”

তাঁর মতে, “মধ্যপ্রাচ্য, তাইওয়ান, হংকংয়ে আমাদের নারী কর্মীদের চাহিদা রয়েছে। নিগ্রহের ঘটনাগুলো তদন্ত করে চিহ্নিত করতে হবে। একটা নারীও নির্যাতিত হলে রাষ্ট্রকে তার দায়িত্ব নিতে হবে।”

ড. জালাল মনে করেন, “সৌদি আরবে নারী কর্মী পাঠানোর শুরুতে আলোচনার টেবিলে নারীদের সুরক্ষার বিষয়ে শক্ত অবস্থান নিতে পারিনি আমরা। দেশটির সাথে আলোচনার মাধ্যমে নারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।”

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের অভিবাসন বিভাগের প্রধান শরিফুল হাসান বেনারকে বলেন, “মেয়েরা অবশ্যই বিদেশে যাবে। আমি গৃহকর্মীর বদলে নার্স, কেয়ারগিভার, পোশাক শ্রমিক পাঠানোর পক্ষে।”

“মধ্য আয়ের দেশ হতে যাওয়া বাংলাদেশের মেয়েদের গৃহকর্মী হিসেবে পাঠানো সম্মাননজনক নয়। তারপরেও পাঠাতে চাইলে তাঁদেরকে দক্ষ করে প্রস্তুত করতে হবে। সৌদি আরবে তাঁদের নিরাপত্তা দিতে ওই দেশকে বাধ্য করতে হবে। সামান্য হলেও নিপীড়নের প্রতিটা ঘটনায় কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে,” বলেন তিনি।

নতুন আইন করছে সরকার

সংসদে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ সম্পূরক প্রশ্নে বলেন, “মা-বোনদের আমরা সৌদি আরবে পাঠাচ্ছি। সেখান থেকে যৌন নির্যাতনসহ নানা রকম অন্যায় অত্যাচারের শিকার হয়ে অবশেষে লাশ হয়ে ফিরে আসে।”

“সৌদি আরবের করা পোস্টমর্টেম রিপোর্টে সকল কর্মীর ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ লেখা থাকে। ওখানে পোস্টমর্টেম যে হয় সেটাও বাংলাদেশ দূতাবাস দেখে না। মন্ত্রণালয় কোনো পদক্ষেপ নেয় না। রিক্রুটিং এজেন্সিরা পাঠিয়েই খালাস।”

জবাবে মন্ত্রী ইমরান আহমদ বলেন, “এসব বিষয়ে সরকার জিরো টলারেন্সে আছে। গত কয়েক মাসে ১৬০টি ট্রাভেল এজেন্সির লাইসেন্স স্থগিত, তিনটি লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। দোষীদের জরিমানা করা হয়েছে।”

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী বলেন, “আমরা আইন করে দিচ্ছি যারা বিদেশ পাঠাবে সৌদি আরবে ওদের কাউন্টার পার্ট রিক্রুটিং এজেন্সির সম্পূর্ণ ডিটেইলস আমাদের দিতে হবে, যাতে আমরা তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারি।

জাতীয় পার্টির আরেক সাংসদ মুজিবুল হক সৌদি আরবে বাংলাদেশি নারী কর্মীদের যৌন নির্যাতন বন্ধ করে সম্মান নিয়ে চাকুরিসহ বেতন নিশ্চিত করার পদক্ষেপের বিষয়ে জানতে চান।

জবাবে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী বলেন, “কয়েক দিন আগে ঢাকায় সৌদি আরব দূতাবাসের চার্জ দ্যা অ্যাফেয়ার্সকে ডেকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকেও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে ওই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করানোর জন্য।”

আগামী ২৬-২৭ নভেম্বর জয়েন্ট টেকনিক্যাল গ্রুপের বৈঠকেও এই বিষয় আলোচনা হবে বলেও জানান তিনি।

ইমরান আহমদ বলেন, “সিদ্ধান্ত হয়েছে, গৃহকর্মী পাঠাতে হলে ন্যূনতম এক মাসের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। পাশাপাশি আইনি ব্যবস্থাসহ তাঁদের অধিকার ও সুরক্ষার বিষয়ে অবহিত করার কাজ শুরু হয়েছে।”

এদিকে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে নারী গৃহকর্মী ও শ্রমিক নির্যাতনের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছে উদ্বিগ্ন নাগরিকবৃন্দের একটি স্বতঃস্ফূর্ত প্ল্যাটফরম। পরে তাঁদের একটি প্রতিনিধিদল প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে ১৩ দফা দাবির স্মারকলিপি প্রদান করে।

খুলছে মালয়েশিয়ার বাজার

বাংলাদেশিদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবারও খুলতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ। এর ফলে এক বছর ধরে বন্ধ থাকা অন্যতম প্রধান এই শ্রম বাজারটিতে আবারও কর্মী পাঠাতে পারবে বাংলাদেশ।

মঙ্গলবার মালয়েশিয়া সফর পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান তিনি। তবে মালয়েশিয়া কর্মী পাঠানো শুরু করার কোনো নির্দিষ্ট তারিখ জানাননি মন্ত্রী। জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের সভার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে বলে জানান তিনি।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী বলেন, “আগামী ২৪ ও ২৫ নভেম্বর ঢাকায় জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের পরবর্তী সভা অনুষ্ঠিত হবে। গ্রুপের সভার পর মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর পুনরায় শুরু হবে বলে আমরা আশাবাদী।”

বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান এই শ্রম বাজারটি উন্মুক্ত হতে যাওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা। তবে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত, কম অভিবাসন খরচে কর্মী পাঠানো, সর্বোপিরি কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

ব্র্যাকের অভিবাসন বিভাগের প্রধান শরিফুল হাসান বেনারকে বলেন, “অতীতে মালয়েশিয়া কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে কোনো স্বচ্ছতা ছিল না, জবাবদিহিতা ছিল না।”

“দু’দেশের দুর্নীতিবাজ চক্রের কিছু লোকজন এক হয়ে প্রতিবার এই অনিয়ম করে থাকে। যার ফলে অভিবাসন খরচ বেড়ে যায়, প্রতিবারই কর্মীরা যেয়ে প্রতারিত হয়েছে, পরে বাজার বন্ধ হয়েছে,” বলেন তিনি।

শরিফুল হাসান বলেন, “সরকারের কাছে আমাদের আশা কীভাবে কর্মী যাবে, কীভাবে চাহিদা আসবে, কত টাকা খরচ হবে- সেট যেন স্বচ্ছ থাকে, জবাবদিহিতা থাকে। অন্যথায় আবারও প্রতিটি কর্মী সঙ্কটে পড়বে, দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে।”

উল্লেখ্য, ২০১২ সালে জিটুজি পদ্ধতিতে কর্মী পাঠাতে চুক্তি করে মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশ। ওই প্রক্রিয়া সফল না হয়ে ২০১৬ সালে পাঁচটি খাতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের সমন্বয়ে ‘জিটুজি প্লাস’ পদ্ধতিতে কর্মী নিতে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে দুদেশ। পাঁচ বছর মেয়াদী এই চুক্তির আওতায় লোক পাঠানোর অনুমতি দেওয়া হয় ১০টি জনশক্তি রপ্তানিকারক এজেন্সিকে।

কিন্তু একটি সংঘবদ্ধ চক্রের অনৈতিক ব্যবসা পরিচালনার কারণে বাংলাদেশের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ২০১৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে বন্ধ করে দেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ। ওই সিদ্ধান্তের ফলে গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে নতুন করে বাংলাদেশি কর্মীদের আর ভিসা দেয়নি দেশটি। তবে বাজার বন্ধের আগে যে সকল কর্মী ভিসা পেয়েছিলেন, তাঁরা মালয়েশিয়ায় যাওয়ার সুযোগ পান। ২০১৮ সালে এক লাখ ৭৫ হাজার ৯২৭ জন বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়াতে প্রবেশ করেন।

এদিকে বন্ধ থাকা এই শ্রমবাজারটি পুনরায় উন্মুক্ত করতে মালয়েশিয়ার সাথে আলোচনা চালিয়ে যেতে থাকে সরকার। তারই অংশ হিসেবে গত ৬ নভেম্বর সরকারি সফরে মালয়েশিয়া যান প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ইমরান আহমদ। বাজারটি উন্মুক্ত করতে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী এম কুলাসেগারানের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের সঙ্গে সাক্ষাত করেও শ্রমবাজারটি পুনরায় খুলতে তাঁর সহযোগিতা চান ইমরান আহমদ।

সংবাদ সম্মেলনে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী বলেন, “ন্যূনতম অভিবাসন ব্যয়ে কর্মী প্রেরণ এবং কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার বিড়ম্বনা নিরসনে বাংলাদেশ থেকে যাওয়ার আগে মাত্র একবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার বিষয়েও দুপক্ষ একমত হয়।”

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “মালয়েশিয়াতে কর্মী পাঠাতে কেবল ১০টি এজেন্সি সুযোগ পাবে না, এবার আমরা রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা বাড়াব।”

তিনি বলেন, মালয়েশিয়া যেতে খরচ কেমন হবে সেটা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি, তবে অভিবাসন মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যাংকের মাধ্যমে কর্মীরা টাকা জমা দেবেন। এছাড়া তাদের জন্য সুরক্ষা সেভিংস নিয়েও আলোচনা চলছে।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন