ড. ইউনূসের গ্রামীণ টেলিকমের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান শুরু

আহম্মদ ফয়েজ
2022.07.28
ঢাকা
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
ড. ইউনূসের গ্রামীণ টেলিকমের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান শুরু শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস । সিউল, অক্টোবর ২০০৬
এএফপি

প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা পাচার ও শ্রমিক-কর্মচারীদের কল্যাণ তহবিলের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে গ্রামীণ টেলিকমের পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান। যদিও তিনি এই প্রতিষ্ঠান থেকে কোনও সুযোগ-সুবিধা নেন না।  

চলতি বছরের মে মাসে এক বিবৃতিতে গ্রামীণ টেলিকমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নাজমুল ইসলাম জানান, গ্রামীণ টেলিকম কোম্পানি আইনের ২৮ ধারায় সৃষ্ট একটি নট ফর প্রফিট কোম্পানি। এই আইনে সৃষ্ট প্রতিষ্ঠানে কোনো মালিক থাকে না। যেহেতু শেয়ারহোল্ডার থাকে না, সেজন্য এর মুনাফাও বণ্টনযোগ্য নয়। প্রফেসর ইউনূস এ ধরণের প্রতিষ্ঠানের মালিক হবার কোনো সুযোগ নেই। গ্রামীণ টেলিকমের যাতে কেউ কোনোদিন মালিক হতে না পারে সেজন্য তিনি এই কোম্পানিকে কোম্পানি আইনের ২৮ ধারায় প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই কোম্পানি বা অন্য কোনো কোম্পানি থেকে তিনি কোনো বেতন নেন না।

গত ২৫ জুন উদ্বোধন হওয়া পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়ন বাতিলের পেছনে ড. ইউনূসের ভূমিকা রয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রীরা অভিযোগ করে আসছেন। 

মূলত সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় নাগরিক শক্তি নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্কে জড়ান ড. ইউনূস।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস কাজল বেনারকে বলেন, “আমরা প্রায়ই দেখি ড. ইউনূসের মতো বিশ্ব বরেণ্য ব্যক্তিকে নিয়ে নানা রকম টানাহেঁচড়া হয়। এটা খুবই দু:খজনক।”

প্রফেসর ইউনূসের বিরুদ্ধে যেভাবে রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিষোদগার করেন, তাতে মনে হয় উনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে থাকতে পারেন, বলেন এই আইনজীবী।

এদিকে বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে দুদক সচিব মো. মাহবুব হোসেন সাংবাদিকদের জানান, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের একটি অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুদক এই অনুসন্ধান শুরু করেছে।

তিনি জানান, গ্রামীণ টেলিকমের পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে তাঁরা শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে বরাদ্দকৃত প্রায় সাড়ে ৪৫ কোটি টাকা (সুদসহ) শ্রমিকদের মধ্যে বিতরণ না করে আত্মসাত করেছে।

দুদক সচিব বলেন, অধিদপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক গ্রামীণ টেলিকম কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ সম্বলিত একটি প্রতিবেদন দুদকে পাঠান। ওই অভিযোগ সম্বলিত প্রতিবেদন কমিশন পর্যালোচনা করে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সেখানে অভিযোগগুলো হলো; অনিয়মের মাধ্যমে শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে বণ্টনের জন্য সংরক্ষিত  লভ্যাংশের পাঁচ শতাংশ অর্থ লোপাট।

শ্রমিক-কর্মচারীদের পাওনা পরিশোধকালে অবৈধভাবে আইনজীবীর ফিসহ অন্যান্য ফিসের নামে ছয় শতাংশ অর্থ কর্তন।

শ্রমিক কর্মচারীদের কল্যাণ তহবিলে বরাদ্দকৃত সুদসহ ৪৫ কোটি ৫২ লাখ ১৩ হাজার ৬৪৩ টাকা বিতরণ না করে আত্মসাৎ।

উক্ত কোম্পানি থেকে দুই হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা মানিলন্ডারিংয়ের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরের মাধ্যমে আত্মসাৎ।

এসব অভিযোগে গ্রামীণ টেলিকমের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে দুদক সচিব বলেন, “অভিযোগের প্রেক্ষিতে কমিশন অনুসন্ধান শুরু করেছে। অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ হওয়ার পরে আপনারাই জানতে পারবেন এর সাথে কে বা কারা সম্পৃক্ত।”

“অভিযোগ অনুসন্ধানকালে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা অবশ্যই গ্রামীণ টেলিকম কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের কাছ থেকে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করবে। অনুসন্ধানের সময় তিনি বিধি-বিধান অনুসারে ব্যবস্থা নেবেন,” যোগ করেন তিনি।

দুদকের এই উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে গ্রামীন টেলিকমের আইনজীবী ব্যারিস্টার মোস্তাফিজুর রহমান খান বেনারকে বলেন, “এই সংক্রান্ত অভিযোগে নিয়ে করা একটি মামলার বিষয় বর্তমানে উচ্চ আদালতে পেন্ডিং আছে। আমরা পরবর্তী শুনানীতে প্রয়োজনীয় নথিপত্র আদালতে উপস্থাপন করব।”

তিনি আরো বলেন, দুদকের অনুসন্ধানের বিষয়টি যথাযথ নিয়ম মেনে আইনীভাবে মোকাবিলা করবে গ্রামীনে টেলিকম।

ইউনূসের মামলা বাতিল প্রশ্নে শুনানি আগস্টে

দুদক এমন সময় ড. ইউনূসের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে যখন মাত্র তিন দিন আগে সোমবার হাইকোর্ট তাঁর বিরুদ্ধে শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে দায়ের করা মামলা বাতিলে জারি করা রুল শুনানির জন্য ১১ আগস্ট দিন ঠিক করে দিয়েছে।

ওই দিন বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামান ও বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ার কাজলের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেয়।

আদালতে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খান। ড. ইউনূসের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী আব্দুল্লাহ আল মামুন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে খুরশীদ আলম বেনারকে বলেন, “মহামান্য আদালত ১১ আগস্ট এই মামলা নিয়ে যে সিদ্ধান্ত দিবেন, সেটাই সকল পক্ষকে মেনে নিতে হবে।”

খুরশীদ আলম দুদকেরও আইনজীবী। তিনি বলেন, দুদক যে অনুসন্ধান শুরু করেছে সেটার সাথে আদালতের কার্যক্রম কোনোভাবেই সাংঘর্ষিক নয় এবং দুদকের অনুসন্ধান চালিয়ে যেতে কোন বাধা নেই।

তিনি বলেন, “ড. ইউনূসের যে মামলাটি হাইকোর্ট স্থগিত করেছিল, আপিল বিভাগ তা দুই মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির জন্য বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামানের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চকে নির্দেশ দেয়। এখানে কলকারখানা অধিদপ্তরের পক্ষে যিনি মামলাটি করেছিলেন, সেই রুল থাকা অবস্থায় তিনি মারা গেছেন। এখন যিনি এই মামলার দায়িত্বে আছেন, তার পক্ষে মামলাটি পরিচালনার জন্য একটি দরখাস্ত দাখিলের অনুমতি চেয়েছিলাম। আর আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি, যেহেতু আপিল বিভাগের নির্দেশনা রয়েছে দুই মাসের মধ্যে মামলাটি নিষ্পত্তি করার জন্য,  সেই আদেশের অনুলিপি আমরা আদালতের কাছে দাখিল করেছি।”

সোমবার মামলাটি আদালতের কার্যতালিকায় আসার পর রুল শুনানির জন্য ১১ আগস্ট দিন ঠিক করে দেয়া হয় বলে জানান এই আইনজীবী।

গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালতে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তরের তৎকালীন শ্রম পরিদর্শক আরিফুজ্জামান বাদি হয়ে ড. ইউনূসসহ চারজনের বিরুদ্ধে এ মামলা করেন।

ড. ইউনূস ছাড়াও অন্য আসামীরা হলেন; গ্রামীন টেলিকমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আশরাফুল হাসান,পরিচালক নুরজাহান বেগম ও মো. শাহজাহান। পরে ওই মামলার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে আবেদন করে গ্রামীন টেলিকম।

গত বছরের ১২ ডিসেম্বর হাইকোর্ট মামলার কার্যক্রম স্থগিত করে রুল দিয়েছিল। এরপর রাষ্ট্রপক্ষ স্থগিতাদেশ বাতিল চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করে।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।