Follow us

বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে মালয়েশিয়াতেও নিষেধাজ্ঞার মুখে জাকির নায়েক

আলী নওফেল
কুয়ালালামপুর
2019-08-29
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
মুম্বাইতে ভারতীয় সাংবাদিকরা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিতর্কিত ইসলাম প্রচারক জাকির নায়েকের বক্তব্য শুনছেন। ১৫ জুলাই ২০১৬।
মুম্বাইতে ভারতীয় সাংবাদিকরা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিতর্কিত ইসলাম প্রচারক জাকির নায়েকের বক্তব্য শুনছেন। ১৫ জুলাই ২০১৬।
[এপি]

যুক্তরাষ্ট্রকে ‘সন্ত্রস্ত’ করার জন্য ওসামা বিন লাদেনকে সমর্থন করা, সমকামী ও ইসলামত্যাগীদের জন্য মৃত্যুদণ্ডের দাবিসহ বহু বিষয়েই দীর্ঘদিন থেকে বিতর্কিত হয়ে আসছেন ভারতীয় ইসলাম প্রচারক জাকির নায়েক।

অর্থ পাচার ও সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ছড়ানোর অভিযোগে নিজ দেশে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে তাঁর নামে, জঙ্গিদের উদ্বুদ্ধ করার অভিযোগে বাংলাদেশেও নিষিদ্ধ জাকির নায়েক বর্তমানে স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে বসবাস করছেন মালয়েশিয়ায়।

কিন্তু সম্প্রতি মালয়েশিয়ার হিন্দু ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের সম্পর্কে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানোর অপরাধে দেশটি তাঁর কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এর আগে থেকেই তিনি যুক্তরাজ্য ও কানাডাসহ বেশ কিছু দেশে অবাঞ্ছিত ব্যক্তি।

বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদ অনুযায়ী, সম্প্রতি মালয়েশিয়াতে লাখো মানুষের এক সমাবেশে জাকির নায়েক দেশটির সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের দেশের প্রতি আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। পাশাপাশি দেশটির চীনা বংশোদ্ভূত জাতিগোষ্ঠীকে মালয়েশিয়ায় ‘অতিথি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

সংখ্যালঘুদের হেয় প্রতিপন্ন করা ও দেশের শান্তি বিনষ্ট করার চেষ্টার দায়ে তাঁর বিরুদ্ধে ১১৫টি অভিযোগ দায়ের হয়। এর প্রেক্ষিতে মালয়েশিয়ার পুলিশ দুবার তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি দেশটিতে তাঁর কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।

নিজের বক্তব্যে জাকির নায়েক ইসলামকে পৃষ্ঠপোষকতা করার জন্য মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের ভূয়সি প্রসংশা করে বলেন “মালয়েশিয়ার হিন্দুরা দেশটির প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বেশি অনুগত।”

এর প্রতিবাদে মালয়েশিয়ার বেশ কয়েকজন অমুসলিম মন্ত্রী জাকির নায়েককে দেশ থেকে বহিস্কারেরও দাবি তোলেন।

জাকির নায়েক বলেন, দেশটির চীনা বংশোদ্ভূত সম্প্রদায় মালয়েশিয়া থেকে তাঁর বহিষ্কার চায়। তাঁদেরই বরং মালয়েশিয়া থেকে বের করে দেয়া উচিৎ। কারণ, তারাও দেশটিতে তাঁর মতো ‘অতিথি’।

বিতর্কিত বক্তব্যের জেরে মালয়েশিয়ার পুলিশ তাঁর কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির পর জাকির নায়েক নিজের বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেও, সমালোচকরা তাঁর বক্তব্যকে পরিপ্রেক্ষিত থেকে বিচ্ছিন্ন করে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

গত সপ্তায় এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “কোনো ব্যক্তি বা জাতিগোষ্ঠীকে আঘাত করা কখনোই আমার উদ্দেশ্য ছিল না।”

“আমার বক্তব্যের পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেবার পরও, আমি মনে করি কেউ যদি আমার বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যার কারণে আঘাত পেয়ে থাকেন, তাঁদের সবার কাছে আমি ক্ষমা প্রার্থনা করছি,” বলেন জাকির নায়েক।

তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা ‘বর্ণবাদী’ অভিযোগ খণ্ডন করে তিনি বলেন, “বর্ণবাদ ইসলামের মূল নীতির বিরোধী, আমি বর্ণবাদের মতো জঘন্য বিষয়ের প্রবল বিরোধী।”

এদিকে নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে মালয়েশিয়া জাকির নায়েককে ভারতে ফেরত পাঠাবে না বলে জানালেও গণমাধ্যমকে মাহাথির মোহাম্মদ বলেন, জাকির নায়েকের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া অভিযোগগুলো আইন অনুযায়ী পুলিশ তদন্ত করবে।

“সমস্যা হচ্ছে আমরা তাঁকে ফেরত পাঠাতে পারি না। কারণ সেখানে তাঁর প্রাণ সংশয় রয়েছে,” মন্তব্য করে মাহাথির মোহাম্মদ বলেন, “যদি অন্য কোনো দেশ তাঁকে নিতে চায়, তবে আমরা স্বাগত জানাব।”

বির্তক, জনপ্রিয়তা ও নিষেধাজ্ঞা

মালয়েশিয়ার বর্তমান ও সাবেক সরকার জাকির নায়েকের প্রতি নমনীয় হলেও বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি দেশে তিনি অবাঞ্ছিত।

২০১৬ সালের জুলাইতে ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলাকারীদের অন্যতম জঙ্গি রোহান ইমিতিয়াজ জাকির নায়েকের অনুসারী বলে জানায় পুলিশ।

হলি আর্টিজানে হামলার তদন্তকারীরা জানান, ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে গা ঢাকা দেবার আগে রোহান জাকির নায়েকের বিভিন্ন বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করেছিলেন।

হালি আর্টিজানে জঙ্গি হামলায় বিদেশী নাগরিকসহ মোট ২৯ জন নিহত হন। এর মাঝে সেনাবাহিনীর উদ্ধার অভিযানে নিহত ৫ জঙ্গির একজন রোহান ইমতিয়াজ (২২)

জাকির নায়েককে বিপজ্জনক ব্যক্তি হিসেবে নিজের টুইটারে উল্লেখ করেন ইসলামি মৌলবাদীদের হুমকির মুখে বাংলাদেশ থেকে নির্বাসিত লেখক তসলিমা নাসরিন।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জঙ্গিরা জাকির নায়েক দ্বারা উদ্বুদ্ধ হবার আশঙ্কা রয়েছে জানিয়ে তিনি মন্তব্য করেন, জাকির নায়েকের হাতে চাপাতি না থাকলেও তাঁর অনুসারীদের হাতে চাপাতি রয়েছে।

ভারতে ২০১৭ সালে জাকির নায়েকের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী সংগঠনকে মদত দেওয়া ও নিজের এনজিওর মাধ্যমে অর্থ পাচারের মামলা দায়ের করা হয়।

চিকিৎসা বিদ্যায় পড়াশোনা করা জাকির নায়েক ২০০৬ সালে দুবাই ভিত্তিক পিস টিভি চালুর মাধ্যমে টেলিভিশনকেন্দ্রীক ধর্ম প্রচারকে পরিণত হন। দিনের ২৪ ঘণ্টা প্রচারিত পিস টিভি ইংরেজি, উর্দু ও বাংলা ভাষায় অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে থাকে।

হলি আর্টিজান হামলার পর বাংলাদেশে পিসি টিভির সম্প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়। ভারত এবং শ্রীলঙ্কায়ও পিস টিভি নিষিদ্ধ। তবে বারো লাখের বেশি গ্রাহক নিয়ে জাকির নায়েকের ইউটিউব চ্যানেল এখনো চালু রয়েছে।

ভারতের মুম্বাইতে জাকির নায়েক ১৯৯১ সালে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ইসলামিক রিসার্চ ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠানটি ইসলাম ধর্মের সঠিক উপস্থাপনা ও ইসলাম সম্পর্কে মানুষের ভুল ধারণা দূর করার কাজ করে বলে জানায় সংগঠনটির ওয়েব সাইট।

ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাকির নায়েকের রয়েছে তুমুল জনপ্রিয়তা। ২০১০ সালে মুম্বাইতে তাঁর ১০ দিনব্যাপী ‘পিস কনফারেন্সে’ দশ লাখের বেশি মানুষ অংশগ্রহণ করেছেন জানিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস তাঁকে দুই বার ‘ভারতে ১০০ জন প্রভাবশালী ব্যক্তি’র তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে।

মুম্বাইর ওই সম্মেলনে মালয়েশিয়ার তখনকার উপপ্রধানমন্ত্রী ও বর্তমান কোয়ালিশন সরকারের অন্যতম নেতা আনোয়ার ইব্রাহিমও যোগ দেন।

জাকির নায়েকের ব্যক্তিত্ব নয় বরং ধর্মই মালয়েশিয়ায় জাকির নায়েকের জনপ্রিয়তার মূল কারণ বলে মন্তব্য করেন দেশটির উটারা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক আহমাদ মারতাদা মোহামেদ।

তিনি বলেন, “ধর্মীয় অনুভূতির কারণেই মালয়েশিয়ার জনগণ তাঁকে সমর্থন করে, ব্যক্তি হিসেবে নয়।”

নৃতত্ত্ববিদ টমাস ব্লম হানসেন এর লেখা “ওয়েজেস অব ভায়োলেন্স’ এর মতে, একজন চিকিৎসকের কোরান ব্যাখ্যার ধরন, কোরান ও হাদিস মনে রাখতে পারার অস্বাভাবিক ক্ষমতা, আরবি, উর্দু ও ইংরেজি ভাষায় বক্তৃতা দেবার যোগ্যতা এবং ইউরোপ ও আমেরিকায় বিভিন্ন ধর্মবেত্তাদের সাথে ইসলাম বিষয়ে বিতর্কে অংশগ্রহণের কারণেই জাকির নায়েক মুম্বাইতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।

অনেক বিশ্লেষকই জাকির নায়েকের বিরুদ্ধে ইসলামের বিভিন্ন মূলনীতিকে বিকৃত করার অভিযোগ করে থাকেন। তবে জাকির নায়েকের ভাষায়, প্রায় ক্ষেত্রেই তাঁর বক্তব্যকে পরিপ্রেক্ষিত থেকে বিচ্ছিন্ন করে ভুল ব্যাখ্যা করেন সমালোচকেরা।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীসহ অনেক প্রভাবশালী নেতাই জাকির নায়েকের সমালোচনা করেছেন। গত এপ্রিলে শ্রীলঙ্কায় আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণে ২৫৯ জনের মৃত্যুর ঘটনার জন্যও জাকির নায়েকের বক্তব্যের প্রভাবকে গত মে মাসে দায়ী করেন নরেন্দ্র মোদী।

‘অবাঞ্ছিত’

যুক্তরাজ্য ও কানাডা ২০১০ সালে জাকির নায়েকেকে দেশগুলোতে প্রবেশের অনুমতি দিতে অস্বীকার করে। দেশ দুটিতে জাকির নায়েকের বেশ কয়েকটি বক্তৃতার অনুষ্ঠান হবার কথা ছিল।

এ প্রসঙ্গে যুক্তরাজ্যের তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেরেসা মে গণমাধ্যমে বলেছিলেন, “ড. নায়েকের অনেকগুলো বক্তব্য আমার কাছে তাঁর অগ্রহণযোগ্য আচরণের প্রমাণ বলে মনে হয়।”

তবে এর তিন বছর পর মালয়েশিয়া তাঁকে “মা-আল হিজরাহ’ ও পাঁচ বছর পর সৌদি আরব তাঁকে ‘কিং ফয়সল ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ ফর সার্ভিস টু ইসলাম ২০১৫’ পুরস্কারে ভূষিত করে।

যুক্তরাষ্ট্রে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে সংঘটিত টুইন টাওয়ার হামলা ‘জর্জ বুশ নিজেই করেছেন’ বলে ২০০৮ সালের ৩১ জুলাই টেলিভিশনে মন্তব্য করেন জাকির নায়েক।

বক্তব্যের শেষে উন্মুক্ত পর্বে, তিনি আল কায়েদা নেতা ওসামান বিন লাদেনকে সন্ত্রাসী মনে করেন কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে জাকির নায়েক বলেন, “তিনি যদি ইসলামের জন্য যুদ্ধ করে থাকেন, তবে আমি তাঁর সাথে আছি।”

“তিনি (লাদেন) যদি দুনিয়ার সবচে বড়ো সন্ত্রাসী আমেরিকার বুকে ত্রাস সৃষ্টির কাজ করে থাকেন, তবে আমি তাঁর সাথে আছি। প্রত্যেক মুসলিমেরই উচিত একজন ত্রাস সৃষ্টিকারী হওয়া। তিনি যদি সন্ত্রাসীর বুকে ত্রাস সৃষ্টি করে থাকেন, তবে তিনি ইসলামকেই অনুসরণ করছেন,” বলেন জাকির নায়েক।

এদিকে জাকির নায়েকের সাম্প্রতিক বক্তব্য মালয়েশিয়ায় ‘অস্বস্তিকর’ পরিস্থিতি তৈরি করেছে বলে গত সপ্তায় গণমাধ্যমের কাছে মন্তব্য করেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন ইয়াসিন।

প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন ওয়াশিংটন ডিসি থেকে নানি ইউসুফ।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন